ঢাকা ০৪:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

রাজশাহীতে রোবট গরু দিয়ে চলছে কাঠের ঘানি,উৎপন্ন হচ্ছে বিশুদ্ধ তেল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ নভেম্বর ২০২২
  • / ৫৭৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নিহাল খান, রাজশাহী ব্যুরো:

প্রাচীনকাল হতে এই উপমহাদেশে কাসুন্দি, বিভিন্ন প্রকার সস,আচার, মোরব্বা, ভর্তা-ভাজি, মুড়ি-চানাচুর ও রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহার হয়ে আসছে। এই তেলের প্রাকৃতিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বর্ণনা করা নিষ্প্রয়োজন।

কিন্তু আধুনিক এই যুগে ভেজাল ও প্রতারণা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। খাঁটি মানের সরিষার তেল সংগ্রহ করা যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি কৃত্রিম ও ভেজাল তেল সনাক্তকরণ আরও কষ্টকর। কৃত্রিম সরিষার তেল তৈরীতে যে বিষক্ত ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হয় তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এমনকি দুরারোগ্য অসুখ ক্যানসার, ডায়েবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ষ্টোক, কিডনি বিকল প্রভৃতি দেখা দেয়।

রাজশাহীতে এক সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল কাঠের ঘানিতে তৈরি সরিষার তেল। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে গছে কলুর বলদ নামের সেই ঐতিহ্য। তবে সেই হারানো ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন জেলার পুঠিয়া উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ইমজামুল হক টিপু। তিনি শিবপুর গ্রামের এছানুল হকের পুত্র।

জানা গেছে, ইমজামুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। উপজেলার শিবপুর বাজারে অবস্থিত যুব এগ্রো ঘানিঘর নামের প্রতিষ্ঠানটি। গরুর মাধ্যমে কাঠের তৈরি ঘানিটা ঘুরছে, আর সরিষা পিষ্ট হয়ে তা থেকে মাটির পাত্রে জমা হচ্ছে সরিষার তেল। খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধে চোখে পানি এসে যাচ্ছে অনেকের। এমনি দৃশ্য চোখে পড়ে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিবপুর বাজারে।

রবিউল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, কয়েক বছর আগেও ঘানিতে ভাঙানো সরিষার তেল দিয়েই মিটতো এই এলাকার অনেক পরিবারের তেলের চাহিদা। বর্তমানে এই ঘানি প্রত্যন্ত গ্রামেও খুঁজে পাওয়া যায়না। ভেজালের এই যুগে শতভাগ খাঁটি তেল খুঁজে পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই কাঠের তৈরি ঘানি।

স্থানীয়রা বলেন, একসময়ে কাঠের ঘানির সাহায্যে ফোঁটায় ফোঁটায় নিংড়ানো খাঁটি সরিষার তেল রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে বিক্রি হতো। এই তেল বিক্রি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন কলু সম্প্রদায়ের লোকেরা। তবে এটি এখন দুর্লভ।

এ ব্যাপারে তরুণ উদ্যোক্তা টিপু বলেন, তিনি তার বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে এ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। অটোরিক্সা বা রোবট গরু দিয়ে ঘানি চালানোর ধারণা পেয়ে তিনি এর উদ্যোগ নেন।

উদ্যোক্তা টিপু আরও বলেন, আমরা বাজার থেকে যেসব তেল ক্রয় করি তার বেশির ভাগ ভেজাল। ভেজালের যুগে মানুষকে ভালো খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি আমি। হালের গরুকে কষ্ট দেওয়ার পরিবর্তে রোবট গরু দিয়ে কাঠের ঘানি থেকে তেল উৎপাদন করছি। এছাড়া গরুর মলমূত্র পড়ার কারনে তেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে এই কারনে গরু ব্যবহার করছিনা। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সকলের সহযোগিতায় এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

টিপু জানান, তার ঘানিতে তৈরি হওয়া খাঁটি সরিষার তেলের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। শুধু এলাকার মানুষই নয়, জেলা শহর থেকেও আগ্রহী ক্রেতারা এসে তেল নিয়ে যায় এখান থেকে।

এ ব্যাপারে কৃষি অফিসার শামসুন নাহার ভুঁইয়া বলেন, পুঠিয়ায় এ ধরনের অটো রোবট গরুর ঘানি ঘর এটাই প্রথম। এখানে খাঁটি সরিষার তেল পাওয়া যাবে তা মুড়ি, ভর্তা ও শিশুদের গায়ে মাখার জন্য খুব উপকারী হবে। এছাড়াও সরিষার তেলে ইরোসিক এসিড থাকায় আমরা ভোজ্য তেল হিসেবে সয়াবিনকে বেছে নিয়েছি। বারি-১৮ সরিষাতে এই ক্ষতিকর ইরোসিক এসিড থাকেনা। এই বারি-১৮ সরিষা ভাঙ্গালে তা ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, ইমজামুল হক টিপুর এই বিশেষ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতনমহল।

নিউজটি শেয়ার করুন

রাজশাহীতে রোবট গরু দিয়ে চলছে কাঠের ঘানি,উৎপন্ন হচ্ছে বিশুদ্ধ তেল

আপডেট সময় : ০৪:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ নভেম্বর ২০২২

নিহাল খান, রাজশাহী ব্যুরো:

প্রাচীনকাল হতে এই উপমহাদেশে কাসুন্দি, বিভিন্ন প্রকার সস,আচার, মোরব্বা, ভর্তা-ভাজি, মুড়ি-চানাচুর ও রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহার হয়ে আসছে। এই তেলের প্রাকৃতিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বর্ণনা করা নিষ্প্রয়োজন।

কিন্তু আধুনিক এই যুগে ভেজাল ও প্রতারণা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। খাঁটি মানের সরিষার তেল সংগ্রহ করা যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি কৃত্রিম ও ভেজাল তেল সনাক্তকরণ আরও কষ্টকর। কৃত্রিম সরিষার তেল তৈরীতে যে বিষক্ত ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হয় তা মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এমনকি দুরারোগ্য অসুখ ক্যানসার, ডায়েবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ষ্টোক, কিডনি বিকল প্রভৃতি দেখা দেয়।

রাজশাহীতে এক সময় বেশ জনপ্রিয় ছিল কাঠের ঘানিতে তৈরি সরিষার তেল। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে গছে কলুর বলদ নামের সেই ঐতিহ্য। তবে সেই হারানো ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন জেলার পুঠিয়া উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ইমজামুল হক টিপু। তিনি শিবপুর গ্রামের এছানুল হকের পুত্র।

জানা গেছে, ইমজামুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। উপজেলার শিবপুর বাজারে অবস্থিত যুব এগ্রো ঘানিঘর নামের প্রতিষ্ঠানটি। গরুর মাধ্যমে কাঠের তৈরি ঘানিটা ঘুরছে, আর সরিষা পিষ্ট হয়ে তা থেকে মাটির পাত্রে জমা হচ্ছে সরিষার তেল। খাঁটি সরিষার তেলের ঝাঁঝালো গন্ধে চোখে পানি এসে যাচ্ছে অনেকের। এমনি দৃশ্য চোখে পড়ে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিবপুর বাজারে।

রবিউল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, কয়েক বছর আগেও ঘানিতে ভাঙানো সরিষার তেল দিয়েই মিটতো এই এলাকার অনেক পরিবারের তেলের চাহিদা। বর্তমানে এই ঘানি প্রত্যন্ত গ্রামেও খুঁজে পাওয়া যায়না। ভেজালের এই যুগে শতভাগ খাঁটি তেল খুঁজে পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এই কাঠের তৈরি ঘানি।

স্থানীয়রা বলেন, একসময়ে কাঠের ঘানির সাহায্যে ফোঁটায় ফোঁটায় নিংড়ানো খাঁটি সরিষার তেল রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে বিক্রি হতো। এই তেল বিক্রি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন কলু সম্প্রদায়ের লোকেরা। তবে এটি এখন দুর্লভ।

এ ব্যাপারে তরুণ উদ্যোক্তা টিপু বলেন, তিনি তার বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে এ সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। অটোরিক্সা বা রোবট গরু দিয়ে ঘানি চালানোর ধারণা পেয়ে তিনি এর উদ্যোগ নেন।

উদ্যোক্তা টিপু আরও বলেন, আমরা বাজার থেকে যেসব তেল ক্রয় করি তার বেশির ভাগ ভেজাল। ভেজালের যুগে মানুষকে ভালো খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি আমি। হালের গরুকে কষ্ট দেওয়ার পরিবর্তে রোবট গরু দিয়ে কাঠের ঘানি থেকে তেল উৎপাদন করছি। এছাড়া গরুর মলমূত্র পড়ার কারনে তেল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে এই কারনে গরু ব্যবহার করছিনা। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সকলের সহযোগিতায় এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

টিপু জানান, তার ঘানিতে তৈরি হওয়া খাঁটি সরিষার তেলের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। শুধু এলাকার মানুষই নয়, জেলা শহর থেকেও আগ্রহী ক্রেতারা এসে তেল নিয়ে যায় এখান থেকে।

এ ব্যাপারে কৃষি অফিসার শামসুন নাহার ভুঁইয়া বলেন, পুঠিয়ায় এ ধরনের অটো রোবট গরুর ঘানি ঘর এটাই প্রথম। এখানে খাঁটি সরিষার তেল পাওয়া যাবে তা মুড়ি, ভর্তা ও শিশুদের গায়ে মাখার জন্য খুব উপকারী হবে। এছাড়াও সরিষার তেলে ইরোসিক এসিড থাকায় আমরা ভোজ্য তেল হিসেবে সয়াবিনকে বেছে নিয়েছি। বারি-১৮ সরিষাতে এই ক্ষতিকর ইরোসিক এসিড থাকেনা। এই বারি-১৮ সরিষা ভাঙ্গালে তা ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে, ইমজামুল হক টিপুর এই বিশেষ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সচেতনমহল।