ঢাকা ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি কি জন্মহারের ফাঁদে পড়ছে

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৩
  • / ৫৮৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জনসংখ্যা আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ? এ নিয়ে তর্ক হয়েছে অনেক। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক যুক্তি ছিল। কিন্তু অভিশাপ মনে করে এই জনসংখ্যা কমাতে গিয়ে কী বিপদেই না পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। বলা যায়, জটিল এক ফাঁদে আটকে গেছে দেশটি।

বর্তমান বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া আবার কী বিপদে পড়ল! উন্নত দেশের আবার কীসের বিপদ! বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন ধারণা করাটা স্বাভাবিক। তবে ভবিষ্যতের দক্ষিণ কোরিয়া কিন্তু ভালো বার্তা দিচ্ছে না কারও জন্য।

ষাটের দশকের পর গত ৬০ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশু জন্মহার কমেছে সবচেয়ে বেশি। ষাটের দশকে দেশটিতে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীরা প্রতিজন গড়ে ৬টি সন্তান জন্ম দিতে পারতেন। ২০২২ সালে তা কমতে কমতে একের নিচে নেমে গেছে। ওই বছর দেশটিতে প্রতি নারীর শিশু জন্মহার ছিল ০.৭৮। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দক্ষিণ কোরিয়াই বিশ্বে একমাত্র দেশ, যেখানে সন্তান জন্মহার একের নিচে।

এভাবে শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে। জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে ৬০ বছর আগের দরিদ্র অবস্থা থেকে এখন উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

এ তো গেল মুদ্রার এক পিঠের চিত্র। এবার মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখার পালা।

এই জন্মহার কমানোর নীতির কারণেই একদিন দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে- এমনটাই মনে করছেন টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডাডলি এল পোস্টন জুনিয়র। এ নিয়ে তাঁর একটি নিবন্ধ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনে।

বয়স্ক, দরিদ্র, আরও নির্ভরশীলতা
একটি দেশের জনসংখ্যা যা আছে, তা রাখতে চাইলে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীদের প্রতিজন গড়ে অন্তত ২টি সন্তান জন্ম দিতে হয়। এখানে দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষদের হিসাবে রাখা হয়নি। কিন্তু ১৯৮৪ সালের পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার কমেই যাচ্ছে। ওই বছর জন্মহার দুইয়ের নিচে নেমে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এভাবে শিশু জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়া সবাইকে অবাক করে দেয়। এ হার ৬ থেকে দুইয়ে নামতে যুক্তরাষ্ট্রে সময় লেগেছিল ১৭০ বছর। আর দক্ষিণ কোরিয়ায় একের নিচে নামতে সময় লেগেছে মাত্র ৬০ বছর।

শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এতে একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়ে যায়। বিপরীতে কমে যায় নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার। আর সেটার প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বলতে বোঝানো হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সে ঘটনাই ঘটেছে। শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার প্রভাবে মাত্র ৬০ বছরের ব্যবধানে দরিদ্র দেশ থেকে ধনী দেশে পরিণত হয়েছে তারা।

অর্থনৈতিক চমকের নেপথ্যে
১৯৫০-৫৩ সময়ে কোরিয়া যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৮২ মার্কিন ডলার।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ১৯৬২ সালে পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। শিশু জন্মহার কমাতেও আরেক পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ৪৫ শতাংশ বিবাহিত দম্পতিকে গর্ভনিরোধক ব্যবহার করতে বলা হয়। এর আগে দেশটিতে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের চল ছিল না বললেই চলে।

দক্ষিণ কোরিয়াবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করেন, কম সন্তান হলে জীবনমান আরও উন্নত হয়। পরিবারে উন্নতি হয়। মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় না। আর তাতেই দ্রুত কমতে থাকে দেশটির শিশু জন্মহার।

এসব পরিকল্পনার কারণে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী কমতে থাকে। তুলনামূলক বাড়তে থাকে কর্মক্ষম মানুষ। ব্যাপক অগ্রগতি আসে দেশটির অর্থনীতিতে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। মাথাপিছু আয় ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার।

সংকট তাহলে কী নিয়ে?
এভাবে জন্মহার কমিয়ে অর্থনীতিতে উন্নতি করা গেলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ফাঁদে পড়তে পারে দেশের অর্থনীতি। তার আগে জানা যাক দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতি আসলে কেমন?

প্রতি বছরই কমছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা। বছরে দেশটিতে যত শিশু জন্ম নেয়, এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায়। একসময় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেশি থাকা দেশটিতে এখন বেড়ে গেছে প্রবীণের সংখ্যা। আগামী বছরগুলোতেও এভাবে বেড়ে যাবে নির্ভরশীল মানুষ।

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের বরাতে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ২০২২ সালে দেশটিতে ২ লাখ ৪৯ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে। এ সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ৪.৪ শতাংশ কম। এ নিয়ে টানা তিন বছর জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হয়েছে দেশটিতে।

এমন নয় যে, ২০২২ সালেই এমন প্রথম হয়েছে। ২০২০ সালে ৩২ হাজার ৬১১, ২০২১ সালে ৫৭ হাজার ১১৮ এবং ২০২২ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ মানুষ কমেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এভাবে চলতে থাকলে ৪ দশকের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ থেকে কমে ৪ কোটির নিচে নেমে আসবে।

আর যে জনগণ থাকবেন, তাদের বেশির ভাগের বয়স হবে ৬৫-এর বেশি। ২০০০ সালে এ হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। ২০ বছর পর ২০২০ সালে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। ২০২৫ সালে হবে ২০ শতাংশ। ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, ২০৬৭ সালে দেশটিতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীর হার হবে ৪৬ শতাংশ (প্রায় অর্ধেক)।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে দেশটির সরকার। এমনকি বিশেষ ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইউল। নেওয়া হয়েছে আরও বিস্তর পরিকল্পনা।

কিন্তু এসব পরিকল্পনা তেমন কাজে আসছে না। ২০০৬ সালের পর এ খাতে ২০ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে দেশটির সরকার। কিন্তু তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।

সরকারের এসব পরিকল্পনা কাজে না লাগার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে বিয়ে বিমুখতা। এমনটাই মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক আন্না লুইস সুসমান। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা একা থাকতে বেশি পছন্দ করেন। গত কয়েক বছরে এ প্রবণতা বেড়েছে। আর সে কারণে সন্তানের জন্মও কম হচ্ছে।

ফাঁদের দ্বারপ্রান্তে
গত ১৬ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার বাড়েনি, বরং কমেই চলেছে। জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, তাতেই ‘কম জন্মহারের ফাঁদে’ পড়েছে দেশটি। হুট করে জন্মহার বাড়াতেও পারবে না। মানুষ বাড়ানোর প্রকৃত উপায় একটাই। আর তা হলো, ব্যাপক হারে অভিবাসী বাড়ানো।

অভিবাসীরা সাধারণত তরুণ। এদের মধ্যে শিশু জন্মহার বেশি থাকে। কিন্তু অভিবাসীদের জন্য যে পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটি, তা মোটেই কার্যকরী নয়। শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার কাউকে বিয়ে করলেই অভিবাসী হওয়ার সুযোগ রয়েছে দেশটিতে।

২০২২ সালে দেশটিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া নাগরিক ছিল ১৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এটি ১৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা বাড়াতে হলে অভিবাসী এখনকার ১০ গুণ হতে হবে।

মোদ্দাকথা, জনসংখ্যা কমতে থাকলে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। আবার হুট করেই জনসংখ্যা বাড়াতে পারবে না তারা। এমন এক সংকটে দেশটি কীভাবে এগিয়ে যায়, তা দেখার বিষয়। তবে অভিবাসী বাড়াতে পারলে দেশটি সংকট কাটাতে পারবে বলেই মনে করছেন জনসংখ্যা বিশারদেরা। তাতে বেড়ে যাবে কর্মী, সচল থাকবে অর্থনীতি। এতে অভিবাসীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি কি জন্মহারের ফাঁদে পড়ছে

আপডেট সময় : ১২:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৩

জনসংখ্যা আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ? এ নিয়ে তর্ক হয়েছে অনেক। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক যুক্তি ছিল। কিন্তু অভিশাপ মনে করে এই জনসংখ্যা কমাতে গিয়ে কী বিপদেই না পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। বলা যায়, জটিল এক ফাঁদে আটকে গেছে দেশটি।

বর্তমান বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া আবার কী বিপদে পড়ল! উন্নত দেশের আবার কীসের বিপদ! বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন ধারণা করাটা স্বাভাবিক। তবে ভবিষ্যতের দক্ষিণ কোরিয়া কিন্তু ভালো বার্তা দিচ্ছে না কারও জন্য।

ষাটের দশকের পর গত ৬০ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশু জন্মহার কমেছে সবচেয়ে বেশি। ষাটের দশকে দেশটিতে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীরা প্রতিজন গড়ে ৬টি সন্তান জন্ম দিতে পারতেন। ২০২২ সালে তা কমতে কমতে একের নিচে নেমে গেছে। ওই বছর দেশটিতে প্রতি নারীর শিশু জন্মহার ছিল ০.৭৮। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দক্ষিণ কোরিয়াই বিশ্বে একমাত্র দেশ, যেখানে সন্তান জন্মহার একের নিচে।

এভাবে শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে। জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে ৬০ বছর আগের দরিদ্র অবস্থা থেকে এখন উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

এ তো গেল মুদ্রার এক পিঠের চিত্র। এবার মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখার পালা।

এই জন্মহার কমানোর নীতির কারণেই একদিন দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে- এমনটাই মনে করছেন টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডাডলি এল পোস্টন জুনিয়র। এ নিয়ে তাঁর একটি নিবন্ধ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনে।

বয়স্ক, দরিদ্র, আরও নির্ভরশীলতা
একটি দেশের জনসংখ্যা যা আছে, তা রাখতে চাইলে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীদের প্রতিজন গড়ে অন্তত ২টি সন্তান জন্ম দিতে হয়। এখানে দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষদের হিসাবে রাখা হয়নি। কিন্তু ১৯৮৪ সালের পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় এই হার কমেই যাচ্ছে। ওই বছর জন্মহার দুইয়ের নিচে নেমে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় এভাবে শিশু জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়া সবাইকে অবাক করে দেয়। এ হার ৬ থেকে দুইয়ে নামতে যুক্তরাষ্ট্রে সময় লেগেছিল ১৭০ বছর। আর দক্ষিণ কোরিয়ায় একের নিচে নামতে সময় লেগেছে মাত্র ৬০ বছর।

শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এতে একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়ে যায়। বিপরীতে কমে যায় নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার। আর সেটার প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বলতে বোঝানো হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সে ঘটনাই ঘটেছে। শিশু জন্মহার কমে যাওয়ার প্রভাবে মাত্র ৬০ বছরের ব্যবধানে দরিদ্র দেশ থেকে ধনী দেশে পরিণত হয়েছে তারা।

অর্থনৈতিক চমকের নেপথ্যে
১৯৫০-৫৩ সময়ে কোরিয়া যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৮২ মার্কিন ডলার।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ১৯৬২ সালে পঞ্চবার্ষিকী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয় দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। শিশু জন্মহার কমাতেও আরেক পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ৪৫ শতাংশ বিবাহিত দম্পতিকে গর্ভনিরোধক ব্যবহার করতে বলা হয়। এর আগে দেশটিতে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের চল ছিল না বললেই চলে।

দক্ষিণ কোরিয়াবাসী উপলব্ধি করতে শুরু করেন, কম সন্তান হলে জীবনমান আরও উন্নত হয়। পরিবারে উন্নতি হয়। মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় না। আর তাতেই দ্রুত কমতে থাকে দেশটির শিশু জন্মহার।

এসব পরিকল্পনার কারণে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী কমতে থাকে। তুলনামূলক বাড়তে থাকে কর্মক্ষম মানুষ। ব্যাপক অগ্রগতি আসে দেশটির অর্থনীতিতে। বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। মাথাপিছু আয় ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার।

সংকট তাহলে কী নিয়ে?
এভাবে জন্মহার কমিয়ে অর্থনীতিতে উন্নতি করা গেলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ফাঁদে পড়তে পারে দেশের অর্থনীতি। তার আগে জানা যাক দক্ষিণ কোরিয়ার পরিস্থিতি আসলে কেমন?

প্রতি বছরই কমছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা। বছরে দেশটিতে যত শিশু জন্ম নেয়, এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ মারা যায়। একসময় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেশি থাকা দেশটিতে এখন বেড়ে গেছে প্রবীণের সংখ্যা। আগামী বছরগুলোতেও এভাবে বেড়ে যাবে নির্ভরশীল মানুষ।

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের বরাতে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ২০২২ সালে দেশটিতে ২ লাখ ৪৯ হাজার শিশু জন্ম নিয়েছে। এ সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ৪.৪ শতাংশ কম। এ নিয়ে টানা তিন বছর জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হয়েছে দেশটিতে।

এমন নয় যে, ২০২২ সালেই এমন প্রথম হয়েছে। ২০২০ সালে ৩২ হাজার ৬১১, ২০২১ সালে ৫৭ হাজার ১১৮ এবং ২০২২ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮০০ মানুষ কমেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। এভাবে চলতে থাকলে ৪ দশকের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ থেকে কমে ৪ কোটির নিচে নেমে আসবে।

আর যে জনগণ থাকবেন, তাদের বেশির ভাগের বয়স হবে ৬৫-এর বেশি। ২০০০ সালে এ হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। ২০ বছর পর ২০২০ সালে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। ২০২৫ সালে হবে ২০ শতাংশ। ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, ২০৬৭ সালে দেশটিতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীর হার হবে ৪৬ শতাংশ (প্রায় অর্ধেক)।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে দেশটির সরকার। এমনকি বিশেষ ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইউল। নেওয়া হয়েছে আরও বিস্তর পরিকল্পনা।

কিন্তু এসব পরিকল্পনা তেমন কাজে আসছে না। ২০০৬ সালের পর এ খাতে ২০ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে দেশটির সরকার। কিন্তু তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।

সরকারের এসব পরিকল্পনা কাজে না লাগার পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে বিয়ে বিমুখতা। এমনটাই মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক আন্না লুইস সুসমান। মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা একা থাকতে বেশি পছন্দ করেন। গত কয়েক বছরে এ প্রবণতা বেড়েছে। আর সে কারণে সন্তানের জন্মও কম হচ্ছে।

ফাঁদের দ্বারপ্রান্তে
গত ১৬ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার বাড়েনি, বরং কমেই চলেছে। জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, তাতেই ‘কম জন্মহারের ফাঁদে’ পড়েছে দেশটি। হুট করে জন্মহার বাড়াতেও পারবে না। মানুষ বাড়ানোর প্রকৃত উপায় একটাই। আর তা হলো, ব্যাপক হারে অভিবাসী বাড়ানো।

অভিবাসীরা সাধারণত তরুণ। এদের মধ্যে শিশু জন্মহার বেশি থাকে। কিন্তু অভিবাসীদের জন্য যে পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটি, তা মোটেই কার্যকরী নয়। শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার কাউকে বিয়ে করলেই অভিবাসী হওয়ার সুযোগ রয়েছে দেশটিতে।

২০২২ সালে দেশটিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া নাগরিক ছিল ১৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এটি ১৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা বাড়াতে হলে অভিবাসী এখনকার ১০ গুণ হতে হবে।

মোদ্দাকথা, জনসংখ্যা কমতে থাকলে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। আবার হুট করেই জনসংখ্যা বাড়াতে পারবে না তারা। এমন এক সংকটে দেশটি কীভাবে এগিয়ে যায়, তা দেখার বিষয়। তবে অভিবাসী বাড়াতে পারলে দেশটি সংকট কাটাতে পারবে বলেই মনে করছেন জনসংখ্যা বিশারদেরা। তাতে বেড়ে যাবে কর্মী, সচল থাকবে অর্থনীতি। এতে অভিবাসীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।