ঢাকা ০২:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

স্বপ্নের মেট্রোরেলের উদ্বোধনের অপেক্ষায় রাজধানীবাসী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২৭:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২২
  • / ৪৬৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মিলন মাহামুদ : 

স্বপ্নের মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে মেট্রোরেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চালু হচ্ছে রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল। দেশের প্রথম বিদ্যুতচালিত এই রেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন বুধবার (২৮ ডিসেম্বর)। সাধারণ জনগণ চলতে পারবেন পরেরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর)।

মেট্রোরেল রাজধানীবাসীর কাছে এখন আর স্বপ্ন নয়। ট্রায়াল রান এরই মধ্যে দেখে ফেলেছে নগরবাসী। দরজায় কড়া নাড়ছে মেট্রোরেল উদ্বোধনের ক্ষণ। এরইমধ্যে মেট্রোরেলের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর বুকে। সাধারণ ট্রেনের মতোই কী মেট্রো? সেখানে সবাই যাতায়াত করতে পারবে, নাকি বিশেষ কোনো শ্রেণির মানুষের জন্য? মেট্রোরেল চলবে কীভাবে, ধীরে নাকি দ্রুত মেট্রোরেল নিয়ে এমন শত প্রশ্ন তাদের মনের মধ্যে। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মেট্রোরেল একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিবহন। এতোদিন সিনেমায় কিংবা লোকমুখে মেট্রোরেলের কথা যারা শুনেছেন, এবার তারা তা নিজ চোখে দেখতে চলেছেন। যাতায়াত করার সুযোগ হচ্ছে। সেজন্য মেট্রোরেল নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের যেন সীমা নেই। এদিকে আগামী ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। লাইন, ট্রাক, কন্ট্রোল সেন্টার থেকে শুরু করে সবর্ত্রই চলছে শেষ সময়ের পরীক্ষা।

বদলে যাচ্ছে উত্তরার দিয়াবাড়ি ও মিরপুর এলাকা। বিশেষ করে দিয়াবাড়ি অংশে বেড়েছে আবাসন খাতে বিনিয়োগ। মিরপুরেও গতি এসেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।

উত্তরার দিয়াবাড়ি অংশে, মেট্রোরেলের স্টেশনকে কেন্দ্র করে বাড়তে শুরু করেছে মানুষের বসবাস। বছর খানেক আগেও, এই অঞ্চলে রাজউকের প্লট ছিল ধূ-ধূ মরুভূমির মতো। যেখানে শরৎকালে কাশবন দেখতে আসতো মানুষ, সেখানে এখন নতুন নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে; উঠছে একের পর এক ভবন।

চলছে মেট্রোরেল উদ্বোধনের প্রস্তুতি, অপেক্ষায় রাজধানীবাসী - নাগরিক -  টেলিভিশন নয়, সম্পর্ক

মেট্রোরেল চালু হলে, হাতেরমুঠোয় চলে আসবে সময়ের হিসাব তাই রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও এরইমধ্যে এখানে গড়ে উঠছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস।

বিশাল এই প্রকল্পের উন্নয়ন-যাতনা, যারা সবচেয়ে বেশি ভোগ করেছেন তারা হলেন মিরপুরের মূল সড়কের পাশের ব্যবসায়ীরা। তবে এখন তারাও স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর।

এদিকে, শেষ মুহূর্তে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে- প্রতিটি স্টেশনকেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিকভাবে। সেই সঙ্গে স্টেশনগুলোর পরতে পরতে রয়েছে প্রযুক্তি ছোঁয়া। এরমধ্যে রাজধানীর আগারগাঁও স্টেশনে যাত্রীদের ওঠানামায় নির্মিত হয়েছে চারটি সিঁড়ি। যেখানে সাধারণ সিঁড়ির পাশাপাশি চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আবার প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য রাখা হয়েছে লিফট ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও চোখে পড়ার মতো।

অন্যদিকে, উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত মেট্রোরেলের স্টেশন দেখতে প্রতিনিয়তই এখন ভিড় করছেন মানুষ। কেউবা চলার পথে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও দেখছেন এর নান্দনিক সৌন্দর্য।

দোকান মালিকরা জানান, ইতিমধ্যেই ক্রেতা আসতে শুরু করেছে দোকানে। আশা করছেন মেট্রোরেল চালু হলে মিটে যাবে পূর্বের সব ক্ষতি।

মিরপুর এলাকা বাসিন্দা আকাশ বলেন, অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে। মেট্রারেল আমাদের স্বপ্নের বিদ্যুতচালিত রেল। যা চালু হলো আমরা যানজট ভোগান্তির থেকে মুক্তি পাচ্ছে। যথা সময়ে নিজ নিজ গন্তব্য পৌঁছাতে পারবে। অপচয়ের এসব তথ্য ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিতে বের হয়েছে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই মেট্রোরেল নির্মিত। মেট্রোরেল-৬ এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও ক্ষতির মাত্রা কমে আসবে। যখন ফুল ফেজে ছয়টি মেট্রোরেল চালু হবে তখন জটলাজনিত কারণে ঢাকায় ক্ষতির পরিমাণ থাকবে না বলা যায়। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।

পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু করল মেট্রো রেল | The Business Standard

আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকার বাসিন্দা মিঠু বেপারী বলেন, যেদিন মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়, সেদিন থেকে দেখতেছি। আমরা এই কাজের কারণে অনেক ভোগান্তি সহ্য করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত যখন সবকিছু হয়ে গেল, এখন ভালো লাগছে। মেট্রোরেলে ওঠার অপেক্ষায় আছি।

কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইতোমধ্যে রাস্তার পুরো অংশ খুলে দেওয়া হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে লোকজনের চলাচলও শুরু হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

কাজীপাড়ার বাসিন্দা আজিম বলেন, মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের জন্য অন্যান্য জায়গায় তুলনায় আমরাই বোধহয় বেশি কষ্ট করেছি। ফুটপাত ছিল না। যে রাস্তায় গাড়ি চলে সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটাচলা করতে হয়েছে। এখন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় ভালো লাগছে। আগের তুলনায় ফুটপাতগুলো আরও আধুনিক করা হয়েছে। আশা করছি এখন আর নতুন করে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।

মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে শেওড়াপাড়ার এক হোটেলের দোকানি বলেন, মেট্রোরেলের কারণে অনেক টাকা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। তবু ধৈর্য ধরে ছিলাম। বিশ্বাস ছিল কাজ শেষ হলে আগের তুলনায় আরও বেশি বেচাবিক্রি হবে। মেট্রোরেল স্টেশনে অনেক লোক আসা-যাওয়া করবে। ফুটপাতগুলোও এখন সুন্দর করেছে। মানুষ আরামে আসা-যাওয়া করছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় কতধরণের যে পরিবর্তন আনতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাজধানীর এই উত্তর প্রান্ত। পুরো দিয়াবাড়ি এলাকাজুড়ে শতশত বাড়ী নির্মিত হচ্ছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন শুধুমাত্র এই মেট্রোরেলের কারণেই তাদের জীবনের এই কর্ম চাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি, অন্যান্য যে নাগরিক সুবিধা, বিশেষ করে দিয়াবাড়ি এলাকায় তা নিশ্চিত করা গেলে, নতুন ঢাকা হবে উত্তরের বিশাল এই এলাকা।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে যাত্রা শুরু স্বপ্নের মেট্র...

রাজধানীর বুক চিরে যাত্রী নিয়ে ছুঁটবে উন্নত দেশের মতো স্বপ্নের মেট্রোরেল। বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য এখন চলছে সিমিউলিটর টেস্ট অর্থাৎ কোন স্টেশনে কতক্ষণ ট্রেন থামবে, ট্রাকের বিভিন্ন বাঁকে কিভাবে ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত টেস্ট চলছে। বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে সে হোমওয়ার্কও চলছে কন্ট্রোল সেন্টারে। কীভাবে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কমিউনিকেশন প্রক্রিয়া, রেলের ট্রাক সব মনিটর করা যাবে এখান থেকে। এমনকি কোনো যাত্রীর কারণে ট্রেনের দরজা বন্ধ করা না গেলে এখান থেকে মনিটর করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ডিএমটিসিএলে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক বলেন, মেট্রোরেল চব্বিশ ঘণ্টা চলাচলের যানবাহন। যতক্ষণ চলবে এর বাইরে মেইনটেইনেন্স করতে হবে। যেহেতু এটা ৩৬৫ দিনই চলবে, সে হিসাব করেই আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেওয়া হয়েছে এবং তারা প্রশিক্ষিত।
স্টেশনের ভেতরের পাশাপাশি রাস্তা আর ফুটপাতে চলছে শেষ সময়ের কাজ। আর এতেই স্বস্তি পাচ্ছেন নগরবাসী। প্রহর গুণছেন চালু হওয়ার।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেল স্টেশন সড়কে কথা হয় ব্যবসায়ী মনসুর আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেট্রোরেল আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। এতোদিন কোনো কোনো সিনেমায় দেখেছি আবার যারা বিদেশ থেকে ঘুরে আসতেন তারা মেট্রোরেল নিয়ে গল্প করতেন, যে কীভাবে মাটির নিচ দিয়ে মেট্রো দ্রুত চলাচল করে। যদিও আমাদের দেশে মেট্রোরেল চলবে উপর দিয়ে। যেভাবেই চলুক চালু হচ্ছে, এতে আমরা ভীষণ খুশি।

সমীক্ষা বলছে, এই নগরে প্রতি বছর ৩৬ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় শুধু যানজটের কারনে। যানজটে ঠেঁসে থাকা এই নগরীকে নি:শ্বাস দিতে ২০১২ সালে মেট্রোরেল নির্মাণের অনুমোদন দেয় সরকার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ৬ ধাপে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সে পরিকল্পনার প্রথম ধাপে গঠন করা হয় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। উড়াল ও পাতাল রেলপথ মিলিয়ে ৬ ধাপে রয়েছে, এমআরটি লাইন-৬, এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫ এ দুই রুট রয়েছে নর্দান ও সাউদার্ন, এমআরটি লাইন-২, এমআরটি লাইন-৪।

এরমধ্যে এমআরটি লাইন-৬ এর হাত ধরেই শুরু হয় মেট্রোরেলের কাজ।
এমআরটি লাইন-৬ এর আওতায় উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ হবে ২১.২৬ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ। এরমধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার পথ চালু হচ্ছে ২৮ ডিসেম্বর। আর এর মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পরের ধাপে নির্মাণ হবে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। এরপর তৃতীয় ধাপে নির্মাণ হবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার রেলপথ।

মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল স্থাপনে চলমান এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিলো ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এরপর কমলাপুর পর্যন্ত যুক্ত হওয়ায় এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এরমধ্যে জাইকা ১৯ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা দিচ্ছে আর সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।

জাপানারে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে রাজধানীর এই মেট্রোরেলে, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম। এমনকি সেই প্রযুক্তি জাপানেও নেই।

জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুচি টমোহুদি জানিয়েছেন, বিদ্যুতচালিত এই ট্রেনের সঙ্গে থাকছে ব্যাটারির ব্যাকআপ। যেটাকে বলা হচ্ছে এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ট্রেনকে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত টেনে নেবে এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। এছাড়াও এই ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা জাপানেও নেই।

জাইকার এই কর্মকর্তা জানান, মেট্রোরেলে ইএসএস সিস্টেম বা এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আছে। যা ট্রেন চলাচলের সময়ই শক্তি সঞ্চয় করে রাখবে। এই শক্তি জমা থাকবে দুটি বগির নিচে থাকা ব্যাটারিতে। কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে জমা রাখা সেই শক্তি ব্যবহার করে রেলটি পরের স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারবে।

তিনি জানান, নিরপত্তা নিশ্চিতের জন্য এরিমধ্যে ৩০ জন বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে জাপানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে যন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে সেটি এখনও জাপানেও ব্যবহার হয়নি।
প্রতিটি রেলে ছয়টি বগি থাকছে। তবে প্রয়োজনে বাড়তি আরও দুটি বগি যুক্ত করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান জাইকার এই কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবেন মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী। আর এই ট্রেনটি সেদিন চালাবেন একজন নারী চালক যার নাম মরিয়ম আফিজা।

চালক মরিয়ম আফিজা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে মেট্রোরেলের চালক হিসেবে গত বছরের ২ নভেম্বর নিয়োগ পান। ইতোমধ্যে মরিয়ম আফিজা চট্টগ্রামের হালিশহরে রেলওয়ের ট্রেনিং একাডেমিতে দুই মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ফিরে আরো চার মাস প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেলের ডিপোতে কারিগরি ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

ঢাকা এবং লাহোর মেট্রোরেল সম্পর্কে কিছু তথ্য - bdidol's bangla blog

উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ মেট্রোরেলে প্রকল্পের প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই অংশে থাকছে ৯টি স্টেশন।

এদিকে, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পরিবর্তে মেট্রোরেল উদ্বোধনের ভেন্যু ঠিক করা হয়েছে দিয়াবাড়ী মাঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহেই স্থান পরিবর্তন করার কথা জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন শেষে মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। টিকিট কেটে দিয়াবাড়ী থেকে উঠে আগারগাঁও স্টেশনে নামবেন তিনি।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বোধনের দুটি স্পটের কথা জানিয়েছিলাম। তিনি খোলা মাঠে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই হিসেবে দিয়াবাড়ী মাঠে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। উদ্বোধন শেষে প্রথম ট্রেনের যাত্রী হবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি টিকিট কেটে উত্তরা থেকে উঠে আগারগাঁও এসে নামবেন।

বুধবার ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল উদ্বোধন হচ্ছে। শুরুতে মেট্রোরেল চলবে দিনে ৪ ঘণ্টা। সকাল ৮ থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলার সময় ট্রেনগুলো মাঝপথে কোথাও যাত্রাবিরতি করবে না।

মেট্রোরেলে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, টিএসসি, প্রেসক্লাব এবং মতিঝিল। তবে আপাতত উত্তরা থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্তই চালু হচ্ছে। পরবর্তীতে তা মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করবে।

এদিকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ দেশের প্রথম এ মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ঠিক করেছে ৫ টাকা। গত ৮ সেপ্টেম্বর ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও প্রকাশ করা হয়। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।

উত্তরা দিয়াবাড়ি (উত্তরা নর্থ স্টেশন) থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত ভাড়া ঠিক করা হয়েছে ৬০ টাকা। উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা সাউথ স্টেশনে যেতে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা দিতে হবে।

সিঙ্গেল জার্নি টিকিট স্টেশনের কাউন্টার থেকে কাটা যায়, চাইলে ‘টিকিট বিক্রয় মেশিন’ থেকে নিজে নিজেও কাজটি সেরে ফেলা যায়। উত্তরা নর্থ থেকে পল্লবী ও মিরপুর-১১ স্টেশনের ভাড়া ৩০ টাকা, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৪০ টাকা এবং শেওড়াপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৫০ টাকা। আর পল্লবী থেকে মিরপুর-১১, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনের ভাড়া একই, ২০ টাকা। পল্লবী থেকে শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও স্টেশনের ভাড়া ৩০ টাকা।

মেট্রোরেলের দ্বিতীয় ধাপ চালু হলে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ফার্মগেট যেতে গুনতে হবে ৩০ টাকা; আর কারওয়ান বাজার যেতে লাগবে ৪০ টাকা। মিরপুর–১০ স্টেশন থেকে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া ৫০ টাকা, সচিবালয় ও মতিঝিল স্টেশনে যেতে লাগবে ৬০ টাকা। তবে মিরপুর-১০ থেকে কমলাপুর স্টেশনে যেতে লাগবে ৭০ টাকা ভাড়া।

তবে দীর্ঘমেয়াদি পাস নিলে ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানি ডিএমটিসিএলকে নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিনা ভাড়া এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

স্বপ্নের মেট্রোরেলের উদ্বোধনের অপেক্ষায় রাজধানীবাসী

আপডেট সময় : ০৪:২৭:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২২

মিলন মাহামুদ : 

স্বপ্নের মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে মেট্রোরেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চালু হচ্ছে রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল। দেশের প্রথম বিদ্যুতচালিত এই রেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন বুধবার (২৮ ডিসেম্বর)। সাধারণ জনগণ চলতে পারবেন পরেরদিন বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর)।

মেট্রোরেল রাজধানীবাসীর কাছে এখন আর স্বপ্ন নয়। ট্রায়াল রান এরই মধ্যে দেখে ফেলেছে নগরবাসী। দরজায় কড়া নাড়ছে মেট্রোরেল উদ্বোধনের ক্ষণ। এরইমধ্যে মেট্রোরেলের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর বুকে। সাধারণ ট্রেনের মতোই কী মেট্রো? সেখানে সবাই যাতায়াত করতে পারবে, নাকি বিশেষ কোনো শ্রেণির মানুষের জন্য? মেট্রোরেল চলবে কীভাবে, ধীরে নাকি দ্রুত মেট্রোরেল নিয়ে এমন শত প্রশ্ন তাদের মনের মধ্যে। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে মেট্রোরেল একটি সম্পূর্ণ নতুন পরিবহন। এতোদিন সিনেমায় কিংবা লোকমুখে মেট্রোরেলের কথা যারা শুনেছেন, এবার তারা তা নিজ চোখে দেখতে চলেছেন। যাতায়াত করার সুযোগ হচ্ছে। সেজন্য মেট্রোরেল নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের যেন সীমা নেই। এদিকে আগামী ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। লাইন, ট্রাক, কন্ট্রোল সেন্টার থেকে শুরু করে সবর্ত্রই চলছে শেষ সময়ের পরীক্ষা।

বদলে যাচ্ছে উত্তরার দিয়াবাড়ি ও মিরপুর এলাকা। বিশেষ করে দিয়াবাড়ি অংশে বেড়েছে আবাসন খাতে বিনিয়োগ। মিরপুরেও গতি এসেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।

উত্তরার দিয়াবাড়ি অংশে, মেট্রোরেলের স্টেশনকে কেন্দ্র করে বাড়তে শুরু করেছে মানুষের বসবাস। বছর খানেক আগেও, এই অঞ্চলে রাজউকের প্লট ছিল ধূ-ধূ মরুভূমির মতো। যেখানে শরৎকালে কাশবন দেখতে আসতো মানুষ, সেখানে এখন নতুন নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে; উঠছে একের পর এক ভবন।

চলছে মেট্রোরেল উদ্বোধনের প্রস্তুতি, অপেক্ষায় রাজধানীবাসী - নাগরিক -  টেলিভিশন নয়, সম্পর্ক

মেট্রোরেল চালু হলে, হাতেরমুঠোয় চলে আসবে সময়ের হিসাব তাই রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও এরইমধ্যে এখানে গড়ে উঠছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস।

বিশাল এই প্রকল্পের উন্নয়ন-যাতনা, যারা সবচেয়ে বেশি ভোগ করেছেন তারা হলেন মিরপুরের মূল সড়কের পাশের ব্যবসায়ীরা। তবে এখন তারাও স্বপ্ন দেখছেন ঘুরে দাঁড়ানোর।

এদিকে, শেষ মুহূর্তে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে- প্রতিটি স্টেশনকেই গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিকভাবে। সেই সঙ্গে স্টেশনগুলোর পরতে পরতে রয়েছে প্রযুক্তি ছোঁয়া। এরমধ্যে রাজধানীর আগারগাঁও স্টেশনে যাত্রীদের ওঠানামায় নির্মিত হয়েছে চারটি সিঁড়ি। যেখানে সাধারণ সিঁড়ির পাশাপাশি চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আবার প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য রাখা হয়েছে লিফট ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও চোখে পড়ার মতো।

অন্যদিকে, উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত মেট্রোরেলের স্টেশন দেখতে প্রতিনিয়তই এখন ভিড় করছেন মানুষ। কেউবা চলার পথে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও দেখছেন এর নান্দনিক সৌন্দর্য।

দোকান মালিকরা জানান, ইতিমধ্যেই ক্রেতা আসতে শুরু করেছে দোকানে। আশা করছেন মেট্রোরেল চালু হলে মিটে যাবে পূর্বের সব ক্ষতি।

মিরপুর এলাকা বাসিন্দা আকাশ বলেন, অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে। মেট্রারেল আমাদের স্বপ্নের বিদ্যুতচালিত রেল। যা চালু হলো আমরা যানজট ভোগান্তির থেকে মুক্তি পাচ্ছে। যথা সময়ে নিজ নিজ গন্তব্য পৌঁছাতে পারবে। অপচয়ের এসব তথ্য ফিজিবিলিটি স্ট্যাডিতে বের হয়েছে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই মেট্রোরেল নির্মিত। মেট্রোরেল-৬ এর মাধ্যমে কিছুটা হলেও ক্ষতির মাত্রা কমে আসবে। যখন ফুল ফেজে ছয়টি মেট্রোরেল চালু হবে তখন জটলাজনিত কারণে ঢাকায় ক্ষতির পরিমাণ থাকবে না বলা যায়। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই।

পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু করল মেট্রো রেল | The Business Standard

আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকার বাসিন্দা মিঠু বেপারী বলেন, যেদিন মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়, সেদিন থেকে দেখতেছি। আমরা এই কাজের কারণে অনেক ভোগান্তি সহ্য করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত যখন সবকিছু হয়ে গেল, এখন ভালো লাগছে। মেট্রোরেলে ওঠার অপেক্ষায় আছি।

কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইতোমধ্যে রাস্তার পুরো অংশ খুলে দেওয়া হয়েছে। ফুটপাত দিয়ে লোকজনের চলাচলও শুরু হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

কাজীপাড়ার বাসিন্দা আজিম বলেন, মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের জন্য অন্যান্য জায়গায় তুলনায় আমরাই বোধহয় বেশি কষ্ট করেছি। ফুটপাত ছিল না। যে রাস্তায় গাড়ি চলে সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটাচলা করতে হয়েছে। এখন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় ভালো লাগছে। আগের তুলনায় ফুটপাতগুলো আরও আধুনিক করা হয়েছে। আশা করছি এখন আর নতুন করে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না।

মেট্রোরেলের কাজ শেষ হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে শেওড়াপাড়ার এক হোটেলের দোকানি বলেন, মেট্রোরেলের কারণে অনেক টাকা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। তবু ধৈর্য ধরে ছিলাম। বিশ্বাস ছিল কাজ শেষ হলে আগের তুলনায় আরও বেশি বেচাবিক্রি হবে। মেট্রোরেল স্টেশনে অনেক লোক আসা-যাওয়া করবে। ফুটপাতগুলোও এখন সুন্দর করেছে। মানুষ আরামে আসা-যাওয়া করছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি জনপদের মানুষের জীবনযাত্রায় কতধরণের যে পরিবর্তন আনতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে রাজধানীর এই উত্তর প্রান্ত। পুরো দিয়াবাড়ি এলাকাজুড়ে শতশত বাড়ী নির্মিত হচ্ছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন শুধুমাত্র এই মেট্রোরেলের কারণেই তাদের জীবনের এই কর্ম চাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি, অন্যান্য যে নাগরিক সুবিধা, বিশেষ করে দিয়াবাড়ি এলাকায় তা নিশ্চিত করা গেলে, নতুন ঢাকা হবে উত্তরের বিশাল এই এলাকা।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে যাত্রা শুরু স্বপ্নের মেট্র...

রাজধানীর বুক চিরে যাত্রী নিয়ে ছুঁটবে উন্নত দেশের মতো স্বপ্নের মেট্রোরেল। বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল পরিচালনার জন্য এখন চলছে সিমিউলিটর টেস্ট অর্থাৎ কোন স্টেশনে কতক্ষণ ট্রেন থামবে, ট্রাকের বিভিন্ন বাঁকে কিভাবে ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত টেস্ট চলছে। বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে সে হোমওয়ার্কও চলছে কন্ট্রোল সেন্টারে। কীভাবে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, কমিউনিকেশন প্রক্রিয়া, রেলের ট্রাক সব মনিটর করা যাবে এখান থেকে। এমনকি কোনো যাত্রীর কারণে ট্রেনের দরজা বন্ধ করা না গেলে এখান থেকে মনিটর করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ডিএমটিসিএলে’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক বলেন, মেট্রোরেল চব্বিশ ঘণ্টা চলাচলের যানবাহন। যতক্ষণ চলবে এর বাইরে মেইনটেইনেন্স করতে হবে। যেহেতু এটা ৩৬৫ দিনই চলবে, সে হিসাব করেই আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেওয়া হয়েছে এবং তারা প্রশিক্ষিত।
স্টেশনের ভেতরের পাশাপাশি রাস্তা আর ফুটপাতে চলছে শেষ সময়ের কাজ। আর এতেই স্বস্তি পাচ্ছেন নগরবাসী। প্রহর গুণছেন চালু হওয়ার।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেল স্টেশন সড়কে কথা হয় ব্যবসায়ী মনসুর আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেট্রোরেল আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। এতোদিন কোনো কোনো সিনেমায় দেখেছি আবার যারা বিদেশ থেকে ঘুরে আসতেন তারা মেট্রোরেল নিয়ে গল্প করতেন, যে কীভাবে মাটির নিচ দিয়ে মেট্রো দ্রুত চলাচল করে। যদিও আমাদের দেশে মেট্রোরেল চলবে উপর দিয়ে। যেভাবেই চলুক চালু হচ্ছে, এতে আমরা ভীষণ খুশি।

সমীক্ষা বলছে, এই নগরে প্রতি বছর ৩৬ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় শুধু যানজটের কারনে। যানজটে ঠেঁসে থাকা এই নগরীকে নি:শ্বাস দিতে ২০১২ সালে মেট্রোরেল নির্মাণের অনুমোদন দেয় সরকার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী মোট ৬ ধাপে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সে পরিকল্পনার প্রথম ধাপে গঠন করা হয় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। উড়াল ও পাতাল রেলপথ মিলিয়ে ৬ ধাপে রয়েছে, এমআরটি লাইন-৬, এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৫ এ দুই রুট রয়েছে নর্দান ও সাউদার্ন, এমআরটি লাইন-২, এমআরটি লাইন-৪।

এরমধ্যে এমআরটি লাইন-৬ এর হাত ধরেই শুরু হয় মেট্রোরেলের কাজ।
এমআরটি লাইন-৬ এর আওতায় উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ হবে ২১.২৬ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ। এরমধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১.৭৩ কিলোমিটার পথ চালু হচ্ছে ২৮ ডিসেম্বর। আর এর মধ্য দিয়ে বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পরের ধাপে নির্মাণ হবে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। এরপর তৃতীয় ধাপে নির্মাণ হবে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১.১৬ কিলোমিটার রেলপথ।

মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল স্থাপনে চলমান এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিলো ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এরপর কমলাপুর পর্যন্ত যুক্ত হওয়ায় এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এরমধ্যে জাইকা ১৯ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা দিচ্ছে আর সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।

জাপানারে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে রাজধানীর এই মেট্রোরেলে, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম। এমনকি সেই প্রযুক্তি জাপানেও নেই।

জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুচি টমোহুদি জানিয়েছেন, বিদ্যুতচালিত এই ট্রেনের সঙ্গে থাকছে ব্যাটারির ব্যাকআপ। যেটাকে বলা হচ্ছে এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। যদি কোনো কারণে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ট্রেনকে পরবর্তী স্টেশন পর্যন্ত টেনে নেবে এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। এছাড়াও এই ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা জাপানেও নেই।

জাইকার এই কর্মকর্তা জানান, মেট্রোরেলে ইএসএস সিস্টেম বা এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আছে। যা ট্রেন চলাচলের সময়ই শক্তি সঞ্চয় করে রাখবে। এই শক্তি জমা থাকবে দুটি বগির নিচে থাকা ব্যাটারিতে। কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে জমা রাখা সেই শক্তি ব্যবহার করে রেলটি পরের স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারবে।

তিনি জানান, নিরপত্তা নিশ্চিতের জন্য এরিমধ্যে ৩০ জন বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে জাপানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য যে যন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে সেটি এখনও জাপানেও ব্যবহার হয়নি।
প্রতিটি রেলে ছয়টি বগি থাকছে। তবে প্রয়োজনে বাড়তি আরও দুটি বগি যুক্ত করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান জাইকার এই কর্মকর্তা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবেন মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী। আর এই ট্রেনটি সেদিন চালাবেন একজন নারী চালক যার নাম মরিয়ম আফিজা।

চালক মরিয়ম আফিজা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে মেট্রোরেলের চালক হিসেবে গত বছরের ২ নভেম্বর নিয়োগ পান। ইতোমধ্যে মরিয়ম আফিজা চট্টগ্রামের হালিশহরে রেলওয়ের ট্রেনিং একাডেমিতে দুই মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ফিরে আরো চার মাস প্রশিক্ষণ নেন। বর্তমানে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেলের ডিপোতে কারিগরি ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

ঢাকা এবং লাহোর মেট্রোরেল সম্পর্কে কিছু তথ্য - bdidol's bangla blog

উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২২ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ মেট্রোরেলে প্রকল্পের প্রায় ১২ কিলোমিটার অংশের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা-আগারগাঁও অংশের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই অংশে থাকছে ৯টি স্টেশন।

এদিকে, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পরিবর্তে মেট্রোরেল উদ্বোধনের ভেন্যু ঠিক করা হয়েছে দিয়াবাড়ী মাঠে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহেই স্থান পরিবর্তন করার কথা জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন শেষে মেট্রোরেলের প্রথম যাত্রী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। টিকিট কেটে দিয়াবাড়ী থেকে উঠে আগারগাঁও স্টেশনে নামবেন তিনি।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বোধনের দুটি স্পটের কথা জানিয়েছিলাম। তিনি খোলা মাঠে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই হিসেবে দিয়াবাড়ী মাঠে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। উদ্বোধন শেষে প্রথম ট্রেনের যাত্রী হবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি টিকিট কেটে উত্তরা থেকে উঠে আগারগাঁও এসে নামবেন।

বুধবার ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল উদ্বোধন হচ্ছে। শুরুতে মেট্রোরেল চলবে দিনে ৪ ঘণ্টা। সকাল ৮ থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলার সময় ট্রেনগুলো মাঝপথে কোথাও যাত্রাবিরতি করবে না।

মেট্রোরেলে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, টিএসসি, প্রেসক্লাব এবং মতিঝিল। তবে আপাতত উত্তরা থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্তই চালু হচ্ছে। পরবর্তীতে তা মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করবে।

এদিকে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ দেশের প্রথম এ মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ঠিক করেছে ৫ টাকা। গত ৮ সেপ্টেম্বর ভাড়ার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও প্রকাশ করা হয়। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা।

উত্তরা দিয়াবাড়ি (উত্তরা নর্থ স্টেশন) থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত ভাড়া ঠিক করা হয়েছে ৬০ টাকা। উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে উত্তরা সেন্টার ও উত্তরা সাউথ স্টেশনে যেতে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা দিতে হবে।

সিঙ্গেল জার্নি টিকিট স্টেশনের কাউন্টার থেকে কাটা যায়, চাইলে ‘টিকিট বিক্রয় মেশিন’ থেকে নিজে নিজেও কাজটি সেরে ফেলা যায়। উত্তরা নর্থ থেকে পল্লবী ও মিরপুর-১১ স্টেশনের ভাড়া ৩০ টাকা, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৪০ টাকা এবং শেওড়াপাড়া স্টেশনের ভাড়া ৫০ টাকা। আর পল্লবী থেকে মিরপুর-১১, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশনের ভাড়া একই, ২০ টাকা। পল্লবী থেকে শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও স্টেশনের ভাড়া ৩০ টাকা।

মেট্রোরেলের দ্বিতীয় ধাপ চালু হলে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ফার্মগেট যেতে গুনতে হবে ৩০ টাকা; আর কারওয়ান বাজার যেতে লাগবে ৪০ টাকা। মিরপুর–১০ স্টেশন থেকে শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া ৫০ টাকা, সচিবালয় ও মতিঝিল স্টেশনে যেতে লাগবে ৬০ টাকা। তবে মিরপুর-১০ থেকে কমলাপুর স্টেশনে যেতে লাগবে ৭০ টাকা ভাড়া।

তবে দীর্ঘমেয়াদি পাস নিলে ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোম্পানি ডিএমটিসিএলকে নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিনা ভাড়া এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।