ঢাকা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

বঙ্গবন্ধুর দেয়া বাড়ির দলিল আজও পাননি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৮:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
  • / ৪৮৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
রাজু আহমেদ রমজান, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর অতিবাহিত হলেও বাড়ির বন্দোবস্ত দলিল ভাগ্যে জুটেনি জাতীয় পদকপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস. এম সামছুল ইসলামের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া রাজধানীর নবাবপুর রোডের মকিম লেন এলাকায় মাত্র দেড় কাঠা জায়গার উপর স্থাপিত ৬৩ লালচান বাড়িতে স্বপরিবারে বসবাস করে আসছেন তিনি। তবে  বাড়ির বন্দোবস্ত দলিল হাতে পাননি আজও। না পাওয়ার বেদনায় মর্মাহত জাতির এই সূর্যসন্তান এমনটাই জানালেন এ প্রতিবেদককে।
শনিবার রাতে (৪ ফেব্রুয়ারী) সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নিকটাত্মীয়ের বাসায় রাত্রিযাপনকালে এ প্রতিবেদকের কাছে না পাওয়ার বেদনায় আক্ষেপ করে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে মর্যাদা দিয়েছেন শুকরিয়া, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় থেকে যে বাড়ি পেয়েছি সেই বাড়িটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুইবার আমাকে প্রতিকী মূল্যে দলিল দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলেছেন। মন্ত্রণালয়ও দুইবার অর্ডার দিয়েছে কমিশনার গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি পাইনি। রাষ্ট্রপতি মহোদয়ও বলেছেন প্রতিকী মূল্য অর্থাৎ একহাজার এক টাকা মূল্যে বাড়ির দলিল দেয়ার জন্য। আমি আজ পর্যন্ত তা পাইনি। এ নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবারও আবেদন, আমি যেন দ্রুত বাড়ির দলিলটি পাই”।
জানা গেছে, রণাঙ্গন থেকে ফেরা এই বীর সেনানী হুইল চেয়ারে চলাচল করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। পঙ্গুত্বের সাথে লড়াই করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আজ। উল্লেখ্য,  এ গ্রেডে সারাদেশে হুইল চেয়ারে চলাচলকারী ১৮ জন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে জীবিত আছেন মাত্র ৩ জন। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে একমাত্র তিনিই কালের স্বাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন।
তাঁর জাতীয় তালিকা নং ৩২৪, লাল মুক্তিবার্তা নং ০৫০২১০০২৯০, সাধারণ গেজেট নং ৭২৩, যোদ্ধাহত গেজেট নং ১১৯৫, সাময়িক সনদপত্র নং ম-০০০০০৩, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রদত্ত কার্ড নং ০৫৯৮ রেজি: নং ৩৮২, জাতীয় পরিচয়পত্র নং ৮২১ ৭৪১ ৬০৯১ সহ বিভিন্ন সরকারী বিবরণীতে এই যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভূক্ত হয়। সার্বক্ষণিকভাবে হুইল চেয়ারে চলাচলকারী এ গ্রেডে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাপ্রাপ্ত এই যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জাতীয় পদকপ্রাপ্তও হয়েছেন।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ-মাতৃকার টানে গ্রাম ছেড়ে ভারতের মেঘালয় প্রদেশের ইকোওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে চলে যান তিনি। সেখানে বেইজ কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাশের নেতৃত্বে ৭১এর ১৫ মে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৫নং সেক্টর কমান্ডার লেঃ জেনারেল অব: মীর শওকত আলী বীরবিক্রম এর অধীনস্থ বালাট সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ মোত্তালিব এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের সুযোগ পান। কোম্পানী কমান্ডার বীর প্রতীক এনামুল হক চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে সদর থানার তৎকালীন বৃহত্তর রঙ্গারচর ইউনিয়নের বৈশারপাড় গ্রামে ১৫ সেপ্টেম্বর পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এই বীর সেনানী। প্রথমে শিলং সামরিক হাসপাতাল, পরে গৌহাটি সামরিক হাসপাতাল, তৃতীয়বারে কলকাতার বেরেকপুর সামরিক হাসপাতাল চতুর্থবারে লখনৌ সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় তাঁকে। ১৯৭২ এর জানুয়ারি মাসে লখনৌ এর কমান্ড সেন্ট্রাল হসপিটালে ৩ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্দী। এই ৩ জনের মধ্যে ছিলেন সামছুল ইসলাম।
দেশ স্বাধীনের পর সবাই বীরের বেশে মায়ের কোলে ফিরে আসলেও সামছুল ইসলামের জন্মস্থান সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের লামাপাড়া গ্রামে আর ফেরা সম্ভব হয়নি। সেদিন থেকে জায়গা হয় পঙ্গু বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একমাত্র আশ্রয়স্থল বিশ্রামাঘারে। সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলে। এর আগে ভারত থেকে দেশে ফিরে সম্মিলিত সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে খুন করার পর মোশতাক সরকার বিশ্রামাগারে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকা শত শত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ  নেয়নি। পরবর্তীতে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসলে শুরু হয় তাদের খোজঁখবর নেয়া। রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকার তাদের বিশ্রামাগারে গিয়ে সূর্যসৈনিক উপাধিতে ভূষিতসহ পূণর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। এসময় হুইল চেয়ারে চলাচল করলেও জীবিকার প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত রাজধানীর গুলিস্থান নাজ সিনেমাহলে টিকেট ম্যানেজারের চাকুরী করেন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান।
বা/খ: জই

নিউজটি শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর দেয়া বাড়ির দলিল আজও পাননি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট সময় : ০৬:৫৮:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
রাজু আহমেদ রমজান, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি :
মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর অতিবাহিত হলেও বাড়ির বন্দোবস্ত দলিল ভাগ্যে জুটেনি জাতীয় পদকপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এস. এম সামছুল ইসলামের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া রাজধানীর নবাবপুর রোডের মকিম লেন এলাকায় মাত্র দেড় কাঠা জায়গার উপর স্থাপিত ৬৩ লালচান বাড়িতে স্বপরিবারে বসবাস করে আসছেন তিনি। তবে  বাড়ির বন্দোবস্ত দলিল হাতে পাননি আজও। না পাওয়ার বেদনায় মর্মাহত জাতির এই সূর্যসন্তান এমনটাই জানালেন এ প্রতিবেদককে।
শনিবার রাতে (৪ ফেব্রুয়ারী) সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নিকটাত্মীয়ের বাসায় রাত্রিযাপনকালে এ প্রতিবেদকের কাছে না পাওয়ার বেদনায় আক্ষেপ করে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে মর্যাদা দিয়েছেন শুকরিয়া, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয় থেকে যে বাড়ি পেয়েছি সেই বাড়িটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুইবার আমাকে প্রতিকী মূল্যে দলিল দেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলেছেন। মন্ত্রণালয়ও দুইবার অর্ডার দিয়েছে কমিশনার গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি পাইনি। রাষ্ট্রপতি মহোদয়ও বলেছেন প্রতিকী মূল্য অর্থাৎ একহাজার এক টাকা মূল্যে বাড়ির দলিল দেয়ার জন্য। আমি আজ পর্যন্ত তা পাইনি। এ নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবারও আবেদন, আমি যেন দ্রুত বাড়ির দলিলটি পাই”।
জানা গেছে, রণাঙ্গন থেকে ফেরা এই বীর সেনানী হুইল চেয়ারে চলাচল করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। পঙ্গুত্বের সাথে লড়াই করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আজ। উল্লেখ্য,  এ গ্রেডে সারাদেশে হুইল চেয়ারে চলাচলকারী ১৮ জন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে জীবিত আছেন মাত্র ৩ জন। এর মধ্যে সিলেট বিভাগে একমাত্র তিনিই কালের স্বাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন।
তাঁর জাতীয় তালিকা নং ৩২৪, লাল মুক্তিবার্তা নং ০৫০২১০০২৯০, সাধারণ গেজেট নং ৭২৩, যোদ্ধাহত গেজেট নং ১১৯৫, সাময়িক সনদপত্র নং ম-০০০০০৩, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রদত্ত কার্ড নং ০৫৯৮ রেজি: নং ৩৮২, জাতীয় পরিচয়পত্র নং ৮২১ ৭৪১ ৬০৯১ সহ বিভিন্ন সরকারী বিবরণীতে এই যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভূক্ত হয়। সার্বক্ষণিকভাবে হুইল চেয়ারে চলাচলকারী এ গ্রেডে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাপ্রাপ্ত এই যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জাতীয় পদকপ্রাপ্তও হয়েছেন।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ-মাতৃকার টানে গ্রাম ছেড়ে ভারতের মেঘালয় প্রদেশের ইকোওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে চলে যান তিনি। সেখানে বেইজ কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাশের নেতৃত্বে ৭১এর ১৫ মে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৫নং সেক্টর কমান্ডার লেঃ জেনারেল অব: মীর শওকত আলী বীরবিক্রম এর অধীনস্থ বালাট সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ মোত্তালিব এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীতে সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের সুযোগ পান। কোম্পানী কমান্ডার বীর প্রতীক এনামুল হক চৌধুরী এমপির নেতৃত্বে সদর থানার তৎকালীন বৃহত্তর রঙ্গারচর ইউনিয়নের বৈশারপাড় গ্রামে ১৫ সেপ্টেম্বর পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এই বীর সেনানী। প্রথমে শিলং সামরিক হাসপাতাল, পরে গৌহাটি সামরিক হাসপাতাল, তৃতীয়বারে কলকাতার বেরেকপুর সামরিক হাসপাতাল চতুর্থবারে লখনৌ সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় তাঁকে। ১৯৭২ এর জানুয়ারি মাসে লখনৌ এর কমান্ড সেন্ট্রাল হসপিটালে ৩ জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্দী। এই ৩ জনের মধ্যে ছিলেন সামছুল ইসলাম।
দেশ স্বাধীনের পর সবাই বীরের বেশে মায়ের কোলে ফিরে আসলেও সামছুল ইসলামের জন্মস্থান সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের লামাপাড়া গ্রামে আর ফেরা সম্ভব হয়নি। সেদিন থেকে জায়গা হয় পঙ্গু বিকলাঙ্গ ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একমাত্র আশ্রয়স্থল বিশ্রামাঘারে। সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলে। এর আগে ভারত থেকে দেশে ফিরে সম্মিলিত সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে খুন করার পর মোশতাক সরকার বিশ্রামাগারে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকা শত শত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ  নেয়নি। পরবর্তীতে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসলে শুরু হয় তাদের খোজঁখবর নেয়া। রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকার তাদের বিশ্রামাগারে গিয়ে সূর্যসৈনিক উপাধিতে ভূষিতসহ পূণর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। এসময় হুইল চেয়ারে চলাচল করলেও জীবিকার প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত রাজধানীর গুলিস্থান নাজ সিনেমাহলে টিকেট ম্যানেজারের চাকুরী করেন জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান।
বা/খ: জই