ঢাকা ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ফিলিস্তিনি তরুণ শোনালেন নির্মম নির্যাতনের কথা

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:৪৫:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৪৯১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ নাজাল। মুক্তির পর অধিকৃত পশ্চিত তীরে ফিরে তিনি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন ভয়াবহ নির্যাতনের গল্প।

মোহাম্মদ নাজাল জানান, ইসরায়েলে কারাবন্দী থাকার সময় তিনি মারধরের শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে কোনো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁকে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আল জাজিরা জানিয়েছে, মোহাম্মদ নাজালের জন্ম অধিকৃত পশ্চিম তীরের কাবাতিয়া শহরে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী মেডিকেল রেকর্ডগুলো একটি নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে এবং তিনি যে ইসরায়েলি কারাগারে নির্মম দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

গত আগস্টে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল ইসরায়েরি বাহিনী। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ নাজালও ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কোনও অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। গত শুক্রবার তিনি যুদ্ধবিরিতির চুক্তি অনুযায়ী বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে কারাগার থেকে মুক্তি পান।

মুক্তির পর মোহাম্মদ নাজাল আল জাজিরাসহ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি বলেন, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দেয় কারারক্ষীরা।

মোহাম্মদ নাজাল বলেন, ‘একজন ইসরায়েলি কারারক্ষী আমাকে আট মিনিট ধরে লাঠি দিয়ে এলোপাথারি পিটিয়েছেন। কোথায় লাঠির বাড়ি পড়ছিল, তার খেয়াল ছিল না। আমি হাত দিয়ে কোনোমতে মাথা ঢেকে রেখেছিলাম। লাঠির আঘাতে আমার হাত ভেঙে গেছে।’

দুই হাতে ব্যান্ডেজ পরা নাজালের ছবি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। নাজাল বলেন, ‘আমার হাত ভেঙে গেছে এবং বেশ কয়েকটি আঙুল ভেঙে গেছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি। ডাক্তার বলেছেন, হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।’

নাজাল অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আমাকে তারা মেঝেতে ফেলে পিটিয়েছে। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে কাতরাতচ্ছিলাম। তবু তারা আমাকে মেঝে থেকে তোলেনি। এমনকি কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা দেয়নি তারা।’

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ নাজালই একমাত্র তরুণ নন, যিনি ইসরায়েলি কারাগারের নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন। এর আগেও ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া অনেক ফিলিস্তিনি বন্দি তাদের দুঃসহ নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন।

এ ছাড়া নাজালের কাছে নির্যাতনের প্রমাণও রয়েছে। আরব ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম মিসবার জানিয়েছে, নাজালকে যেদিন মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেদিনই তাঁর মেডিকেল রেকর্ডগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রেকর্ডগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, নাজালের হাতের পেছনের হাড়গুলোতে ফ্র্যাকচার হয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর নাজালের বেশ কিছু ছবি তোলা হয়। সেসব ছবিতেও দেখা যায়, নাজালের পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া নাজালের হাতের এক্সরে রিপোর্টেও হাতে ফাটলের চিহ্ন ধরা পড়েছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিসহ আরও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নাজালের মেডিকেল রেকর্ডগুলো যাচাই বাছাই করে বলেছে, ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তারা বন্দিদের প্রয়োজনীয় পানি, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা ওফির গেন্ডেলম্যান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ভিডিওতে তিনি দাবি করছেন, কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর নাজালকে একটি রেড ক্রসের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় তার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য। তখন তার হাতে কোনো ব্যান্ডেজ ছিল না। এখন তার হাতে ব্যান্ডেজ কোথা থেকে এল? এর অর্থ হচ্ছে, তিনি মিথ্যাচার করছেন। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সময় তিনি ভালো ও সুস্থ ছিলেন।

এ সময় ভিডিওতে তিনি নাজালকে দেখান। ভিডিওতে দেখা যায়, নাজাল ব্যান্ডেজ ছাড়াই রেড ক্রসের গাড়িতে উঠছেন। ওফির গেন্ডেলম্যান বলেন, নাজাল একজন মিথ্যাবাদী। ফিলিস্তিনিরা এমনই করে থাকে। তারা সুকৌশলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

এদিকে টানা সাত দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ না হতেই গত শুক্রবার গাজায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। সেই হামলা গতকাল রোববারও অব্যাহত ছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৭০০ ফিলিস্তিনি মারা গেছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।

গত ৭ অক্টোবরের পর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছে এবং হামাস অন্তত ২৪০জনকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনি তরুণ শোনালেন নির্মম নির্যাতনের কথা

আপডেট সময় : ০২:৪৫:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৩

হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন ফিলিস্তিনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ নাজাল। মুক্তির পর অধিকৃত পশ্চিত তীরে ফিরে তিনি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন ভয়াবহ নির্যাতনের গল্প।

মোহাম্মদ নাজাল জানান, ইসরায়েলে কারাবন্দী থাকার সময় তিনি মারধরের শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে কোনো চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁকে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

আল জাজিরা জানিয়েছে, মোহাম্মদ নাজালের জন্ম অধিকৃত পশ্চিম তীরের কাবাতিয়া শহরে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী মেডিকেল রেকর্ডগুলো একটি নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে এবং তিনি যে ইসরায়েলি কারাগারে নির্মম দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

গত আগস্টে শতাধিক ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছিল ইসরায়েরি বাহিনী। তাঁদের মধ্যে মোহাম্মদ নাজালও ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কোনও অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। গত শুক্রবার তিনি যুদ্ধবিরিতির চুক্তি অনুযায়ী বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে কারাগার থেকে মুক্তি পান।

মুক্তির পর মোহাম্মদ নাজাল আল জাজিরাসহ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোকে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি বলেন, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দেয় কারারক্ষীরা।

মোহাম্মদ নাজাল বলেন, ‘একজন ইসরায়েলি কারারক্ষী আমাকে আট মিনিট ধরে লাঠি দিয়ে এলোপাথারি পিটিয়েছেন। কোথায় লাঠির বাড়ি পড়ছিল, তার খেয়াল ছিল না। আমি হাত দিয়ে কোনোমতে মাথা ঢেকে রেখেছিলাম। লাঠির আঘাতে আমার হাত ভেঙে গেছে।’

দুই হাতে ব্যান্ডেজ পরা নাজালের ছবি তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। নাজাল বলেন, ‘আমার হাত ভেঙে গেছে এবং বেশ কয়েকটি আঙুল ভেঙে গেছে। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি। ডাক্তার বলেছেন, হাড় জোড়া দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।’

নাজাল অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আমাকে তারা মেঝেতে ফেলে পিটিয়েছে। আমি প্রায় অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে কাতরাতচ্ছিলাম। তবু তারা আমাকে মেঝে থেকে তোলেনি। এমনকি কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা দেয়নি তারা।’

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ নাজালই একমাত্র তরুণ নন, যিনি ইসরায়েলি কারাগারের নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন। এর আগেও ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া অনেক ফিলিস্তিনি বন্দি তাদের দুঃসহ নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন।

এ ছাড়া নাজালের কাছে নির্যাতনের প্রমাণও রয়েছে। আরব ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম মিসবার জানিয়েছে, নাজালকে যেদিন মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেদিনই তাঁর মেডিকেল রেকর্ডগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রেকর্ডগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, নাজালের হাতের পেছনের হাড়গুলোতে ফ্র্যাকচার হয়েছে।

কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর নাজালের বেশ কিছু ছবি তোলা হয়। সেসব ছবিতেও দেখা যায়, নাজালের পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া নাজালের হাতের এক্সরে রিপোর্টেও হাতে ফাটলের চিহ্ন ধরা পড়েছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিসহ আরও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নাজালের মেডিকেল রেকর্ডগুলো যাচাই বাছাই করে বলেছে, ইসরায়েলের কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তারা বন্দিদের প্রয়োজনীয় পানি, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে না।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা ওফির গেন্ডেলম্যান একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। ভিডিওতে তিনি দাবি করছেন, কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর নাজালকে একটি রেড ক্রসের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় তার পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য। তখন তার হাতে কোনো ব্যান্ডেজ ছিল না। এখন তার হাতে ব্যান্ডেজ কোথা থেকে এল? এর অর্থ হচ্ছে, তিনি মিথ্যাচার করছেন। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সময় তিনি ভালো ও সুস্থ ছিলেন।

এ সময় ভিডিওতে তিনি নাজালকে দেখান। ভিডিওতে দেখা যায়, নাজাল ব্যান্ডেজ ছাড়াই রেড ক্রসের গাড়িতে উঠছেন। ওফির গেন্ডেলম্যান বলেন, নাজাল একজন মিথ্যাবাদী। ফিলিস্তিনিরা এমনই করে থাকে। তারা সুকৌশলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

এদিকে টানা সাত দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ না হতেই গত শুক্রবার গাজায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। সেই হামলা গতকাল রোববারও অব্যাহত ছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৭০০ ফিলিস্তিনি মারা গেছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।

গত ৭ অক্টোবরের পর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছে এবং হামাস অন্তত ২৪০জনকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ১৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।