শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:০৭ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতাদের চাহিদা পূরণে পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ভেন্যু নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব শুক্রবার কেটে যাবে: হারুন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন ঝড়বৃষ্টির শঙ্কা চিকিৎসকরা উপজেলায় যেতে চান না : স্বাস্থ্যমন্ত্রী সচিবরা নিজেদের রাজা মনে করেন: হাইকোর্ট বিএনপি চায় কমলাপুর স্টেডিয়াম, ডিএমপি বলছে বাঙলা কলেজ নারী শিক্ষার প্রসারে বেগম রোকেয়ার অবদান অন্তহীন প্রেরণার উৎস: প্রধানমন্ত্রী ‘বিয়ে’ করছেন শুভ-অন্তরা! দুজনেরই সিদ্ধান্ত বিয়ে করব না: নুসরাত ফারিয়া স্পিকারের সঙ্গে চীন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ হাসপাতালে রোগীদের বারবার একই টেস্ট বন্ধ কর‍তে হবে : মেয়র আতিক নয়াপল্টনে ‘সহিংসতা’র সুষ্ঠু তদন্ত চায় যুক্তরাষ্ট্র ফখরুল সাহেব, হুঁশ হারাবেন না, অবস্থা শিশুবক্তার মতো হবে: হানিফ রাঙ্গাবালীতে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ  সাঁথিয়ায় অটোবাইক চাপায় প্রাণ গেল শিশুর

পাবনায় বাঁধের প্রভাবে নদী-বিল বদ্ধ জলাশয়; বিলুপ্তির পথে দেশি মাছ

শফিউল আযম, বিশেষ প্রতিনিধি :

পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণ করায় জেলার অভ্যন্তরীণ নদ-নদী-বিল বদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়েছে। অনেক নদী বিল ক্রমাগত পলি পড়ে ভরাট হয়ে ফসলী জমি ও মৎস্য খামারে পরিনত হয়েছে। আত্রাই নদী বুকে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও হাট বাজার। দূষণে জলাশয়ের পানি বিষক্ত হয়ে পড়ছে। যার কারণে নদ-নদী, বিল, জলাশয়ে জেলেদের জালে আগের মতো মাছ ধরা পড়ে না। বিশেজ্ঞরা বলছেন, কালবাউস, রিঠা, গুজো, মহাশৌল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বড় বাইম, গজার, চিতল, ফলি, রায়াক, কাকিলা, বৌরানীসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

৭০ দশকের শেষ দিকে কার্তিক-অগ্রহায়ণ-পৌষ-মাঘ মাসে রতœাই, আত্রাই, সুতিখালী, চিকনাই, চন্দ্রাবতী,
কাগেশ্বরী, বাদাই, ইছামতি নদী গাঙভাঙ্গা, কাজলকুড়া, ধলকুড়া, ইটাকাটা, ঘুঘুদহসহ প্রায় ৫০টি বিলে পানি
কমতে থাকলে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। এখন সেসব দেখা যায় না। বর্ষাকালে ধানের জমিতে কইয়া জাল, বড়শি ও চাই পেতে মাছ ধরা হতো। নদী বিল শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ ধরার রীতিও হারিয়ে গেছে অনেক এলাকা থেকে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বাজার থেকে
চাষের মাছ কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় মাছ হারিয়ে যাওয়ার জন্য মূলত অনেকগুলো কারণ দায়ী। এরমধ্যে জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, চায়না দোয়ার, কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার, মা মাছ শিকার জলাশয় দূষণ, বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ, নদ-নদীর নাব্যতাহৃস, নদী- খাল- বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, ডিম ছাড়ার আগেই অবাধে মা মাছ শিকার, বিল-ডোবা-নালা-পুকুর ছেঁকে মাছ ধরা, মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটানো। এই ১৪টি কারণে ৫০ প্রজাতির দেশি মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

পাবনার সুজানগর উপজেলার তালিমনগর গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, ৭০ দশকের শেষ পর্যন্ত পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত গাজানার বিলের আত্রাই, বাদাই নদীসহ ৫টি বিলে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। পাওয়া যেত ১২ থেকে ১৪ কেজি ওজনের বোয়াল ও আইড় মাছ। এমন কোন মাছ ছিল না যা এ অঞ্চলের নদী-বিলে পাওয়া
যেত না। এলাকার গাজনার বিলে তারা জাল দিয়ে ৮ কেজি ওজনের কালবাউশ মাছ ধরেছেন। এক সময় ছিল বেলে, চেলা, ভেদা, চেং, খসল্লা প্রভৃতি মাছ খাওয়ার অযোগ্য মনে করে ধরার পর ফেলে দিতেন। এখন আর সেদিন নেই বলে তারা জানান। ৮০ দশকে বণ্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণ করায় পদ্মার নদীর সাথে এসব নদী বিলের সংযোগ বিচ্ছিন হয়ে যায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, হারিয়ে যাওয়া দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। হাটবাজারে এখন আর মিঠাপানির সুস্বাদু দেশি মাছ মিলছে না। দেশে হাইব্রিড জাতের সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, মিরর কার্প, কমন কার্প, বিগহেড, থাইসরপুঁটি, থাই কৈ, থাই পাঙ্গাস, ব্লাক কার্প, আফ্রিকান মাগুর, পাঁচ প্রজাতির
তেলাপিয়াসহ ২৪ প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। হাইব্রিড জাতের মাছ চাষের আগে পুকুর ডোবার পানিতে নানা
প্রকার বিষ মেশানোর কারনে মাছ, শামুক ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা হ্রস পাচ্ছে। মৎস্যজীবীরা জানিয়েছেন, অধিক মুনাফার আশায় হাইব্রিড মাছের চাষ করতে গিয়ে জলাশয়গুলো থেকে দেশি মাছের বিলুপ্ত ঘটানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮০ দশকে বণ্যা নিয়ন্ত্রন ও কৃষির উন্নয়নে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন বাঁধ
নির্মাণ করার পর থেকে জেলার অভ্যন্তরীণ নদ-নদী ও বিলের সাথে পদ্মা, বড়াল, হুড়াসাগর ও যমুনা নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ নদ-
নদীগুলো বদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও কিটনাশক ব্যবহারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। একই সঙ্গে পোনা আহরণ নেটজাল ও মশারি জাল ব্যবহার করে
নদীবিলে মাছ ধরার কারণেও দেশীয় প্রজাতীর মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানা গেছে, চার দশক আগে দেশের উপকুলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রায় আড়াইশ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যেত। বেড়া চতুরবাজারের মাছের আরৎদার আক্কাস আলী বলেন, ‘৩৫-৪০’ বছর আগেও আমাদের এলাকায় মাছ
কিনে খাওয়ার তেমন রেওয়াজ ছিল না। কেনার মধ্যে শুধু ইলিশ মাছ কেনার কথাই মনে পড়ে। মাছের প্রয়োজন হলে সবাই বাড়ীর সামনে খালে বা নদীতে চলে যেত। খালে পুকুরে তখন এতো মাছ ছিল যে, পানিতে নেমে খালি হাতেও মাছ ধরতে পারতো।

এ প্রসঙ্গে সাঁথিয়ার গাঙভাঙ্গা বিলপাড়ের আফড়া গ্রামের মৎস্য খামারি আউব আলী বলেন, তাদের বাড়ীর পাশে বিল ছিল। জন্মের পর থেকেই বিল দেখছি। ২০-২২ বছর আগেও সারাবছর ধরে বাড়ির সবাই বিল থেকে মাছ ধরতো। শীত মওসুমে শত শত মানুষ পলো, জাল, ডালা, খুচন নিয়ে মাছ ধরতে নেমে যেত। কেউ কেউ খালি হাতে মাছ ধরত। বোয়াল, কাতল, মৃগেল, লওলা, শোল, গজার, কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, আইড়, ভ্যাদা, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, চিতলসহ বিভিন্ন জাতের মাছ ধরা পড়ত। এখন ওই বিল শুকিয়ে যায়। চেলা, পুটি, টাকি, খলিসা ছাড়া কোন মাছ নেই। বিলসলঙ্গী গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিলন মিয়া বলেন, স্থানীয় ধুলাউড়ি হাটের দিন দেশি প্রজাতির অনেক মাছ উঠত। এখন আর সেসব মাছ ওঠে না। বাজার ভরা থাকে চাষের পাঙ্গাস আর তেলাপিয়ায়। দেশি মাছ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিল-নদী শুকিয়ে যাওয়া, বোরো ধান ও শাক-সবজিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারকে তিনি দায়ী করেন।

মৎস্য বিশেজ্ঞরা বলছেন, নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় ও প্লাবন ভূমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সরকারি উদ্যোগে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় ও প্লাাবন ভূমি পূনঃখননের মাধ্যমে পানি ধারনক্ষমতা বাড়ানো হলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায় দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির তালিকায় ঠাঁই নেবে।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন কারণেই দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে পাবদা, গোংসা, বোয়াল, আইড়, শিং মাছের চাষ হচ্ছে। পাঙ্গাসের চাষ হচ্ছে বেশ ক’বছর আগে থেকেই। কৈ মাছেরও চাষ হচ্ছে। দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষায় মৎস্য অধিদফতর প্রতি বর্ছ মৎস্য মেলার আয়োজন করে আসছে।

বা/খ: এস আর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *