ঢাকা ০৩:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

নরসিংদীতে ফুলে ফলে ভরে গেছে আশ্বিনা শিমের মাচা

সাইফুল ইসলাম রুদ্র, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৫৮১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নরসিংদীর বাজারে উঁকি দিতে শুরু করেছে শীতের অন্যতম জনপ্রিয় সব্জী আশ্বিনা শিম। কার্তিকের হালকা কুয়াশা ভেজা এক কেজি আশ্বিনা শিম বিক্রি হচ্ছে ২শত থেকে ৩শত টাকা কেজি দরে। তবে নতুন মাচা হিসেবে উৎপাদন খুবই কম। চাষীরা জানিয়েছে, এই সময়ে সারা মাচা থেকে বড়জোর ২ থেকে ৩ কেজি শিম তোলা যায় প্রতিদিন।
১০ থেকে ১৫ দিন পরই তোলা যাবে ১০ থেকে ২০ কেজি করে প্রতিদিন। চাষীরা আশা করছে এ বছর সীম চাষ করে তারা অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।

শিবপুর উপজেলার দক্ষিণ সাধারচর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাছেদ দুই বিঘা জমিতে আশ্বিনা শিমের চাষাবাদ করেছেন। ইতোমধ্যেই তার শিমের বাগান থেকে শিম তুলে বাজারে বিক্রি করেছেন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কেজি শিম বিক্রি করে উপার্জন করছেন ৭ শ’ থেকে ১ হাজার টাকা।

অনেক আশা নিয়ে এই চাষী তার শিম ক্ষেত পরিচর্যা করে চলছেন। একইভাবে পরিচর্যা চলছে শীতের অন্যান্য সব্জী ক্ষেতেও। ফুলকপি, বাধাকপি, মুলা, লাউ, গাজর, উচ্ছে, টমেটো, আলু, বেগুন, স্কোয়াশ, লাল শাক, পালং শাক, সরিষা শাক, বাটি শাক, মটরশুটি, বথুয়া ইত্যাদি শাক-সব্জীর ক্ষেতও ফলনোন্মুখ হয়ে উঠেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব শাকসব্জী বাজারে আসতে শুর করবে। শাক-সব্জীর জন্য বিখ্যাত নরসিংদী জেলার চাষীরা প্রতিবছরই শীতকালীন সব্জীর আগাম চাষাবাদ করে নগদ টাকা উপার্জন করে থাকে। দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট চাষ কমে যাবার পর এ এলাকার চাষীরা শাকসব্জী চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এ বছরও শ্রাবণ মাসের মধ্যভাগ থেকেই শীতকালীন সব্জী আগাম চাষাবাদ করেছিল চাষীরা। কিন্তু অতি বৃষ্টির কারণে কয়েক দফা শাকসব্জী আবাদ করেও তারা সফল হতে পারেনি। যার জন্যে এ বছর শীতের সব্জী বাজারে আমদানী হতে দেরি হয়েছে কমবেশী এক মাস। এরপর চাষীরা হাল ছাড়েনি। মার খাওয়া আগাম সব্জী ক্ষেতগুলোকে নতুন করে তৈরি করতে শুর করেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী জেলার ৬টি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহ কমবেশী ১০ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন শাকসব্জী চাষাবাদ হয়ে থাকে। এ বছর আগাম চাষাবাদে মার খাওয়ায় ফলনের এরিয়া এখনো ২ হাজার হেক্টর পিছিয়ে গেলেও আমন ধান কাটার পর তা পুরন হয়ে যাবে।

নরসিংদী জেলায় উৎপাদিত শাকসব্জী রাজধানী ঢাকাসহ দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে কমবেশী ৪০ ভাগ চাহিদা পুরণ করে। এর মধ্যে বেশীরভাগই হয়ে থাকে আশ্বিনা শিম। আঞ্চলিক ভাষায় এ শিমকে বলা হয় কাতিমারা শিম। এই শিমের বৈশিষ্ট হলো আশ্বিন মাস ছাড়া কোনো সময়ই এই শিম আগাম উৎপাদিত হয় না। কৃষিবিধরা জানিয়েছে, শিম আগাম রোপন করলে লতাপাতায় মাচা ভরে যায়। কিন্তু ফলন হয়না। আশ্বিন মাস না এলে এই শিমের ফলন দেখা যায় না। কৃষি বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করেও এই শিমের আগাম ফলন ঘটাতে পারেনি। আশ্বিনা শিম আশ্বিন মাসেই ফলে। শিবপুর, রায়পুরা, বেলাব ও মনোহরদী উপজেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে বিস্ত্রীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা যায় বিশাল বিশাল শিম ক্ষেত। এসব ক্ষেতে উৎপাদিত শিম আশ্বিন মাস থেকে শুর করে চৈত্র-বৈশাখ মাস পর্যন্ত মানুষের সব্জী চাহিদা পূরণ করে।

আশ্বিনা শিম বাজারে প্রথম আমদানীর সময় তা হয় ধনীদের সব্জী। অগাহায়ন মাসে সীমের দাম কমলে তা সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে এই সীম খেয়ে থাকে। নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচিওয়ালা আশ্বিনা শিম খুব জনপ্রিয় হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ এই আশ্বিনা শিম শুটকি দিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকে। বিচিওয়ালা আশ্বিনা শিম নিরামিশ রান্নাও খুবই জনপ্রিয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা শিমের বিচি খুবই পছন্দ করে। শিমের বিচিতে উচ্চ মানের প্রোটিন থাকায় বাবা-মারা শিশুদেরকে এই শিমের বিচি খাইয়ে থাকে।

এছাড়া যে কোনো মাছের তরকারীর সাথে শিম সংমিশ্রণে তরকারী রান্না করা নরসিংদীসহ দেশের একটি পুরনো সংস্কৃতি। শীতের সকালে আদা দিয়ে আশ্বিনা শিমের ভর্তা একটি মুখরোচক খাবার। বাঙালীরা যুগযুগ ধরে গরম ভাতের সাথে আশ্বিনা শিমের ভর্তা খেয়ে রসনা তৃপ্ত করে আসছে। যেসব চাষী আশ্বিনা সীম চাষাবাদ করে তাদের বাড়ীর উঠানেও এই সীমের চাষাবাদ করে থাকে। কৃষকদের অধিকাংশই শীতের প্রায় প্রতিদিন টাকি মাছ, শোল মাছ, গজার মাছ, শিং মাছ, মাগুর মাছ, চিংড়ি মাছ, ও বড় মাছের মাথা ভেঙ্গে সীমের লাড়া রান্না করে খেয়ে থাকে। শুধু তাই নয় নরসিংদীতে উৎপাদিত এই আশ্বিনা শিম মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানী হয়ে থাকে। আশ্বিনা শিম বিক্রি করে নরসিংদীর কৃষকরা তাদের সারা বছরের নগদ অর্থের চাহিদা পুরণ করে থাকে।

 

বাখ//আর

নিউজটি শেয়ার করুন

নরসিংদীতে ফুলে ফলে ভরে গেছে আশ্বিনা শিমের মাচা

আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৩

নরসিংদীর বাজারে উঁকি দিতে শুরু করেছে শীতের অন্যতম জনপ্রিয় সব্জী আশ্বিনা শিম। কার্তিকের হালকা কুয়াশা ভেজা এক কেজি আশ্বিনা শিম বিক্রি হচ্ছে ২শত থেকে ৩শত টাকা কেজি দরে। তবে নতুন মাচা হিসেবে উৎপাদন খুবই কম। চাষীরা জানিয়েছে, এই সময়ে সারা মাচা থেকে বড়জোর ২ থেকে ৩ কেজি শিম তোলা যায় প্রতিদিন।
১০ থেকে ১৫ দিন পরই তোলা যাবে ১০ থেকে ২০ কেজি করে প্রতিদিন। চাষীরা আশা করছে এ বছর সীম চাষ করে তারা অতীতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।

শিবপুর উপজেলার দক্ষিণ সাধারচর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাছেদ দুই বিঘা জমিতে আশ্বিনা শিমের চাষাবাদ করেছেন। ইতোমধ্যেই তার শিমের বাগান থেকে শিম তুলে বাজারে বিক্রি করেছেন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কেজি শিম বিক্রি করে উপার্জন করছেন ৭ শ’ থেকে ১ হাজার টাকা।

অনেক আশা নিয়ে এই চাষী তার শিম ক্ষেত পরিচর্যা করে চলছেন। একইভাবে পরিচর্যা চলছে শীতের অন্যান্য সব্জী ক্ষেতেও। ফুলকপি, বাধাকপি, মুলা, লাউ, গাজর, উচ্ছে, টমেটো, আলু, বেগুন, স্কোয়াশ, লাল শাক, পালং শাক, সরিষা শাক, বাটি শাক, মটরশুটি, বথুয়া ইত্যাদি শাক-সব্জীর ক্ষেতও ফলনোন্মুখ হয়ে উঠেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এসব শাকসব্জী বাজারে আসতে শুর করবে। শাক-সব্জীর জন্য বিখ্যাত নরসিংদী জেলার চাষীরা প্রতিবছরই শীতকালীন সব্জীর আগাম চাষাবাদ করে নগদ টাকা উপার্জন করে থাকে। দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট চাষ কমে যাবার পর এ এলাকার চাষীরা শাকসব্জী চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এ বছরও শ্রাবণ মাসের মধ্যভাগ থেকেই শীতকালীন সব্জী আগাম চাষাবাদ করেছিল চাষীরা। কিন্তু অতি বৃষ্টির কারণে কয়েক দফা শাকসব্জী আবাদ করেও তারা সফল হতে পারেনি। যার জন্যে এ বছর শীতের সব্জী বাজারে আমদানী হতে দেরি হয়েছে কমবেশী এক মাস। এরপর চাষীরা হাল ছাড়েনি। মার খাওয়া আগাম সব্জী ক্ষেতগুলোকে নতুন করে তৈরি করতে শুর করেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী জেলার ৬টি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সমূহ কমবেশী ১০ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন শাকসব্জী চাষাবাদ হয়ে থাকে। এ বছর আগাম চাষাবাদে মার খাওয়ায় ফলনের এরিয়া এখনো ২ হাজার হেক্টর পিছিয়ে গেলেও আমন ধান কাটার পর তা পুরন হয়ে যাবে।

নরসিংদী জেলায় উৎপাদিত শাকসব্জী রাজধানী ঢাকাসহ দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে কমবেশী ৪০ ভাগ চাহিদা পুরণ করে। এর মধ্যে বেশীরভাগই হয়ে থাকে আশ্বিনা শিম। আঞ্চলিক ভাষায় এ শিমকে বলা হয় কাতিমারা শিম। এই শিমের বৈশিষ্ট হলো আশ্বিন মাস ছাড়া কোনো সময়ই এই শিম আগাম উৎপাদিত হয় না। কৃষিবিধরা জানিয়েছে, শিম আগাম রোপন করলে লতাপাতায় মাচা ভরে যায়। কিন্তু ফলন হয়না। আশ্বিন মাস না এলে এই শিমের ফলন দেখা যায় না। কৃষি বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করেও এই শিমের আগাম ফলন ঘটাতে পারেনি। আশ্বিনা শিম আশ্বিন মাসেই ফলে। শিবপুর, রায়পুরা, বেলাব ও মনোহরদী উপজেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে বিস্ত্রীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা যায় বিশাল বিশাল শিম ক্ষেত। এসব ক্ষেতে উৎপাদিত শিম আশ্বিন মাস থেকে শুর করে চৈত্র-বৈশাখ মাস পর্যন্ত মানুষের সব্জী চাহিদা পূরণ করে।

আশ্বিনা শিম বাজারে প্রথম আমদানীর সময় তা হয় ধনীদের সব্জী। অগাহায়ন মাসে সীমের দাম কমলে তা সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে। সাধারণ মানুষ বিভিন্নভাবে এই সীম খেয়ে থাকে। নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিচিওয়ালা আশ্বিনা শিম খুব জনপ্রিয় হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ এই আশ্বিনা শিম শুটকি দিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকে। বিচিওয়ালা আশ্বিনা শিম নিরামিশ রান্নাও খুবই জনপ্রিয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা শিমের বিচি খুবই পছন্দ করে। শিমের বিচিতে উচ্চ মানের প্রোটিন থাকায় বাবা-মারা শিশুদেরকে এই শিমের বিচি খাইয়ে থাকে।

এছাড়া যে কোনো মাছের তরকারীর সাথে শিম সংমিশ্রণে তরকারী রান্না করা নরসিংদীসহ দেশের একটি পুরনো সংস্কৃতি। শীতের সকালে আদা দিয়ে আশ্বিনা শিমের ভর্তা একটি মুখরোচক খাবার। বাঙালীরা যুগযুগ ধরে গরম ভাতের সাথে আশ্বিনা শিমের ভর্তা খেয়ে রসনা তৃপ্ত করে আসছে। যেসব চাষী আশ্বিনা সীম চাষাবাদ করে তাদের বাড়ীর উঠানেও এই সীমের চাষাবাদ করে থাকে। কৃষকদের অধিকাংশই শীতের প্রায় প্রতিদিন টাকি মাছ, শোল মাছ, গজার মাছ, শিং মাছ, মাগুর মাছ, চিংড়ি মাছ, ও বড় মাছের মাথা ভেঙ্গে সীমের লাড়া রান্না করে খেয়ে থাকে। শুধু তাই নয় নরসিংদীতে উৎপাদিত এই আশ্বিনা শিম মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানী হয়ে থাকে। আশ্বিনা শিম বিক্রি করে নরসিংদীর কৃষকরা তাদের সারা বছরের নগদ অর্থের চাহিদা পুরণ করে থাকে।

 

বাখ//আর