ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

নকল দুধের প্রভাবে দেশীয় দুগ্ধশিল্প ও জনস্বাস্থ্য চরম ঝূঁকিতে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৪:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩
  • / ৪৯১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

//শামছুর রহমান শিশির //

পবিত্র রমজান মাসে পাবনা-সিরাজগঞ্জে উৎপন্ন গরুর তরল দুধের চাহিদা সারাদেশে বহুলাংশে বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি দুধের উৎপাদন। বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ায় উৎপন্ন তরল দুধ দেশে দুধের মোট চাহিদা পূরণ করতে পারছে ন। ঘাটতি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে দিনে প্রায় দেড় লাখ লিটার। আর এই ঘাটতি পূরণের সুযোগে এক শ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু দুধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশ্রণ করে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরি করে বাড়তি চাহিদানুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহের মহোৎসবে মেতে উঠেছে । সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত নজরদারীর অভাবে ওই অসাধু চক্রটি ছানার টক পানি, মিল্ক পাউডার, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজ, লবন, কেমিক্যালসহ নানা ধরণের উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল ও নকল দুধ দেদারসে তৈরি করছে। এদিকে পবিত্র রমজান মাসে দেশে তরল দুধের বর্ধিত চাহিদার যোগান দিতে এ অঞ্চলের বেশকিছু মুনাফাখোর অসাধু দুধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায় নানা উপায়ে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। অসাধু চক্রটি প্রথমে টাটকা দুধ থেকে ননী তুলে ননী দিয়ে ঘি তৈরি করছে, ননী বিহীন দুধ টানা দুধ দিয়ে কেউবা নিম্নমানের ছানা তৈরি করে সেটা শারাম দুধের ছানার দামে বিক্রি করছে; আবার অনেকে ননী বিহীন টানা দুধের সাথে সোয়াবিন, চিনি ও কেমিক্যেল মিশিয়ে দুধের ঘনত্ব তৈরি করে খাটি বা শারাম দুধের দামে বিক্রি করছে। আবার অনেকে ড্রামকে ড্রাম ছানার টক পানি সংরক্ষণ করে সেই পানির সাথে ফরমালিন, কাটিং ওয়েলসহ মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল ও নকল তরল দুধ তৈরি করে দুধের বর্ধিত চাহিদা পূরণে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করছে। নানা অসাধু উপায়ে দুধে ভেজালকারী ওই চক্রটি এক দুধ তিন-চারবার বিক্রি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন। দেশের সর্ববৃহত সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী  সমবায় সমিতি লিমিটেড-‘মিল্কভিটা’ ও এ অঞ্চলের বিভিন্ন বেসরকারি ডেইরি প্রজেক্ট কর্তৃক নির্ধারিত প্রতি লিটার দুধের দামের চেয়ে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরিকারী চক্রটি অবৈধ পন্থায় উপার্জিত বিপুল অবৈধ অর্থের দাপটে রমজানে গো-খামারীদের দুধের দাম লিটারপ্রতি বেশী দিয়ে দুধ ক্রয় করে তার সাথে ভেজাল মিশ্রণ করে অতিরিক্ত চাহিদার এক দেড় লাখ লিটার নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করছে। এতে, এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত নকল ও ভেজাল দুধ খেয়ে দেশের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে নানান জটিল রোগে; তাদের জীবন ও ভবিষ্যত বিপন্ন হতে চলেছে। অন্যদিকে, ভেজালকারীদের অবৈধ ও অনৈতিক দৌরাত্ব আর দাপটে দুগ্ধ ব্যবসায়ের ভরা মৌসুমে মিল্কভিটার বাঘাবাড়ি ও মোহনপুর কারখানায় দুধ সংগ্রহের হার আশংকাজনক হারে কমে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে মিল্কভিটা! গত ২০০৮ সালের পর দু’এক বছর নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের কোনঠাঁসা করলেও গত প্রায় ১ যুগে নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। ফলে ভেজালকারীদের সংখ্যা ও দৌরাত্ব শংকাজনক হারে বেড়েছে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর উত্তর পাশে স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্কভিটা) এর প্রধান কারখানা। মিল্কভিটা’কে কেন্দ্র করে বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৪২ সহস্রাধিক গো-খামার। এসব গো-খামারে প্রতিদিন গড়ে চার লাখ লিটার দুধ উৎপন্ন হয়। এছাড়া বাঘাবাড়ি মিল্কসেড এরিয়ার পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই গাভী লালন-পালন করা হয়। এসব গাভী থেকেও দৈনিক আরো প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ লিটার দুধ পাওয়া যায়। দৈনিক উৎপন্ন পাঁচ থেকে শোয়া পাঁচ লাখ লিটার গরুর দুধ মিল্কভিটা’সহ বেসরকারি নানা ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টার, ঘোষ সম্প্রদায়সহ মধ্যস্বত্বভোগীতের কাছে খামারিরা বিক্রি করে আসছেন।

দেশের দুগ্ধশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু এ অঞ্চলে প্রাণ, আকিজ, আফতাব, ব্রাক ফুড (আড়ং), ফ্রেস মিল্ক, নাভানা মিল্ক, আমোফ্রেস মিল্ক, কোয়ালিটি, বিক্রমপুরসহ বেশ কিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করতে এ অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক ও শাখা দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে। এর ফলে তরল দুধ সংগ্রহের পরিমান দিন দিন বাড়তে থাকে। কিন্তু বাড়েনি দুধের উৎপাদন। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর অঞ্চল (বাঘাবাড়ি মিল্কসেড এরিয়া) এর হাজার হাজার পরিবার তাদের জীবিকার পথ হিসেবে গাভী পালন ও দুধের ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার গো-খামার। এদিকে দুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ছানা উৎপাদক ও অসাধু বেশ কিছু দুধ ব্যবসায়ীরা নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে বেসরকারী নানা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছেন।ভেজালকারীদের অবৈধ এ ব্যবসার রাতারাতি প্রবৃদ্ধি দেখে অনেকেই ভেজাল ও নকল দুধ তৈরির কারবারে উৎসাহিত  ও জড়িয়ে পড়েছেন ।

 

সিরাজগঞ্জ ও পাবনা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রমজান মাসে দেশে দৈনিক দুধের চাহিদা এক লাখ লিটার বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে সাত লাখ লিটারে দাঁড়িয়েছে । কিন্তু এ অঞ্চলে প্রতিদিন দুধ উৎপন্ন হচ্ছে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার। ৮-৯ মাস আগেও বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করতো। দুধের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, প্রাণ ডেইরি (পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর) দেড় লাখ লিটার, পৌণে দুই লাখ লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, আমোফ্রেস মিল্ক, ব্রাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা এক লাখ লিটার, তিন শতাধিক মিষ্টির দোকানে ৪০ হাজার লিটার, রমজান মাসে হাট-বাজারে স্থানীয় ক্রেতারা প্রায় ৯০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করে থাকেন। এ হিসেবে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি পড়ে দেড় লাখ লিটারেরও বেশি।

অসাধু ব্যবসায়ীরা ছানার টক পানি, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডার, ফরমালিন, সোডা, সয়াবিন, কেমিক্যালসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরি করে নানা স্থানে সরবরাহের মাধ্যমে দুধের ওই বিশাল ঘাটতি পূরণ করছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কেবলমাত্র,  মিল্কভিটা’র কারখানায় বিশ্বের সর্বাধিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ‘মিরিস মিল্ক এ্যানালাইজার’ দিয়ে দুধের সতেজতা ও গুণগত মান পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকায় মিল্কভিটা’য় ভেজাল ও নকল দুধ সরবরাহের কোন সুযোগ নেই। তারপরেও সমবায়ী গো-খামারিদের কারো দুধে যদি ভেজাল ধরা পড়ে তাহলে তার সদস্যপদ বাতিলসহ তার বিরুদ্ধে  কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় মিল্কভিটা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও কাজীপুর উপজেলার ঘোষ সম্প্রদায় ও দুধ ব্যবসায়ীদের শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার দুধের ছানা তৈরি করা হয়। এসব কারখানায় অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে নিমিষেই দুধ থেকে শতভাগ ননী (ফ্যাট) বের করে নেয়া হয়। পরে ওই ননী বিহীন দুধ (টানা দুধ) জ্বালিয়ে তাতে ময়দা মিশিয়ে নিন্মমানের ছানা (টানা দুধের ছানা) তৈরি করে তা উৎকৃষ্ট ও খাঁটি ছানা (শারাম দুধের ছানা) হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়। আবার এসব কারখানায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ননী বিহীন টানা দুধের সাথে চিনি, সোয়াবিন তেল, জ্বাল দেয়া তরল আটা ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে দুধের কৃত্রিম ঘনত্ব প্রস্তুত করে বিভিন্ন বেসরকারি ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টারের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহযোগীতায় লিটারপ্রতি কমিশন বাণিজের ভিত্তিতে শতভাগ ননী বিহীন ভেজাল দুধকে ননীযুক্ত শতভাগ টাটকা দুধ হিসেবে খাঁটি দুধের দামেই অসাধু উপায়ে চালিয়ে দিয়ে প্রতিদিন মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

আবার, এসব কারখানার মালিক অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ছানার টক পানি ফেলে না দিয়ে ‘টক পানি ছাড়া ছানা কাটা সম্ভব নয়’-এমন অজুহাতে তা বড় বড় ড্রামে সংরক্ষণ করে রাখে। পরে ওই ছানার পানির সাথে ফরমালিন, কাটিং ওয়েলসহ মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে তারা তৈরি করে ভেজাল ও নকল তরল দুধ। এ দুধের সাথে চিনি ও সয়াবিন তেল মেশানোর ফলে দুধের ফ্যাট ল্যাকটোমিটারে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি প্রদর্শণ করে। যে কারণে কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল ও নকল দুধ বিক্রিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের কোন বেগই পোহাতে হচ্ছে না! অনেকে আবার মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের পাউডার গুঁড়ো দুধ জ্বাল দিয়ে তা খাঁটি দুধ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, রমজান মাসে সারাদেশে দুধের চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও সে চাহিদার অনুপাতে এ অঞ্চলে বাড়েনি দুধ উৎপন্নের হার। আর এ সুযোগে এ অঞ্চলের কিছু আসাধু দুধ ব্যবসায়ী ও ঘোষেরা নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে স্থানীয় বেসরকারি কতিপয় ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টারসহ ও পরিবহনযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছে। আর ঢাকাসহ অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী জেলাগুলোতে দুধ পরিবহনের ক্ষেত্রে অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা দুধে ফরমালিন মিশিয়ে দিচ্ছে। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা এসব বিষাক্ত দুধ টাটকাই থেকে যাচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তারা প্রতি মন ছানার পানিতে আধা কেজি ননী, আধা কেজি স্কিমমিল্ক পাউডার সামান্য পরিমান লবন, খাবার সোডা, এক কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি (এসেন্স) মিশিয়ে অবিকল দুধ তৈরি করছে, যা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া আসল না নকল তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কতিপয় অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই ভেজাল ও নকল দুধ সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা লিটার প্রতি কমিশন নিয়ে টাটকা খাঁটি দুধ হিসেবে বেসরকারি দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিতে সহযোগীতা করছে। এসব দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে নকল দুধের সাথে খাঁটি দুধ মেশানোর ফলে সব দুধই ভেজালে পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া, এসব অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা দুধকে সতেজ রাখতে মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর ফরমালিন ব্যবহার করছে। তাছাড়া, দুধ থেকে শতভাগ ফ্যাট (ননী) বের করে নেয়ার ফলে দুধের পুষ্টিমানও কমে যাচ্ছে। আর এ দুধ বেশি দামে কিনেও অজান্তেই ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। দেখার কেউ নেই।

ছানার পানি ছাড়াও অন্য এক পদ্ধতিতে অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা নকল দুধ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক মন ফুটন্ত পানিতে আধা কেজি দুধের ননী, আধা কেজি স্কিমমিল্ক পাউডার, কয়েক ফোঁটা কাটার অয়েল, ২৫০ গ্রাম হাইড্রোজ, সমপরিমান লবন, ৫০০ গ্রাম সয়াবিন তেল ও এক ফোঁটা ফরমালিন মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। ক্ষতিকর স্কিমমিল্ক পাউডার ভারত থেকে সীমান্ত পথে দেশে প্রবেশ করছে। সূত্র আরও জানায়, দুধের ল্যাকটো ও ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল সনাক্ত করা হয় বলে নকল ও ভেজাল দুধে চিনি, লবন, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয়। এতে দুধের ঘনত্ব ও ল্যাকটো বেড়ে যাওয়ার ফলে ল্যাকটোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে ভেজাল সনাক্ত সম্ভব হয়না। তাছাড়া, এসব ভেজাল তরল দুধ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহকালে যেনো নষ্ট না হয় সেজন্য দীর্ঘসময় দুধ সতেজ রাখতে মেশানো হয় ফরমালিন। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় ল্যাকটোমিটার দিয়ে অসাধু এসব দুধ ব্যবসায়ীদের সুক্ষ্ম প্রতারণা ধরা সম্ভব হয় না।

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ির খামারি মোঃ জাকির হোসেন বলেন, গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সে তুলানায় দুধের দাম বাড়েনি। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ দশমিক ৫০ স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাটের (ননী যুক্ত) দুধ প্রতি লিটার ৫০-৫১ টাকা দরে কিনছে। এই মানের দুধ খুব কম উৎপন্ন হয়। খোলা বাজারে প্রতিলিটার দুধ ৬৫-৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ গো-খামারি দাদন নেয়ায় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম দামে দুধ সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে, অব্যাহত লোকসানে অনেক খামারিরা গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, তার খামারে শতাধিক গরু ছিল। এখন মাত্র ৩-৪টি গাভী আছে। তাদের দুগ্ধ সমিতিতে আগে ৪৩-৪৪ ক্যান দুধ হতো। এখন মাত্র ৩-৪ ক্যান দুধ পাওয়া যায়। তার মতো অনেকে খামারি গরু বিক্রি করে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। তাদের কাছে এক সময়ের সম্ভাবনাময় দুগ্ধ শিল্প এখন লাভজনক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নাভানা মিল্কের ব্যবস্থাপক জগলুল হায়দার জানান, দুধ শুধু আমরাই নয়, আড়ং, আকিজ, আমোমিল্ক, আফতাব, মিল্কভিটাসহ অন্যান্য কোম্পানি সংগ্রহ করে থাকে। তবে তাদের দুধ সংগ্রহ পদ্ধতি শতভাগ ভেজালমুক্ত। তারা সরাসরি গো-খামারী ও ব্যবসায়দের কাছ থেকে কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারী দ্বারা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পরীক্ষায় ভেজালমুক্ত নিশ্চিত হয়ে তবেই দুধ সংগ্রহ করে থাকেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জামাল হায়দার চৌধুরী জানান, কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল দুধ দীর্ঘদিন পান করলে মানবদেহে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে হেপাটোটক্সিকিটি বা লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডারের ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যকার দুরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যাথা অনুভব, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

 

বিজ্ঞমহলের মতে, পবিত্র রমজান মাসে দেশে দুধের বর্ধিত চাহিদাকে পুঁজি করে এ অঞ্চলের কতিপয় নকল ও ভেজাল দুধ ব্যবসায়ীরা জনস্বাস্থ্যকে জিম্মি করে বিপুল অবৈধ অর্থবিত্তের মালিক হলেও কেমিক্যাল মিশ্রিত এসব ভেজাল দুধ পান করায় দেশের শিশুসহ আমজনতা আক্রান্ত হচ্ছে নানা জটিল রোগে। তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে চলেছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে দু’একজন ভেজাল দুধ ব্যবসায়ীকে অর্থদন্ড দেয়ার খবর পাওয়া গেলেও তা ‘গুরু পাপে লঘু দন্ড’র মতোই বিবেচিত হওয়ায় কোনভাবেই নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারী অসাধু ব্যবসায়ীদে্র দৌড়াত্ব রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশবাসীর জনস্বাস্থ্য জিম্মিকারী অসাধু এসব দুধ ব্যবসায়ীদের ‘গুরু পাপে গুরু দন্ড’র মতোই কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে ভবিষ্যতে এদের দৌড়াত্ব আরও বেড়ে যাবে ; সেইসাথে সম্ভব হবে না নকল ও ভেজাল দুধের ভোক্তা শিশুসহ আমজনতার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টিও।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০০৮ সালের ১০ আগষ্ট একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকায় ‘পাবনা সিরাজগঞ্জে নামীদামী ব্রান্ডের আকর্ষণীয় মোড়কে প্যাকেটজাত নকল তরল দুধে বাজার সয়লাব; শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে জটিল রোগে: তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ  বিপন্ন হতে চলেছে’ এ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশবাসী সর্বপ্রথম নকল ও ভেজাল তরল দুধ সম্পর্কে জানতে পারে। ওই সংবাদ প্রকাশিত হবার পর জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র দৃষ্টিগোচর হয়। পরে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি তদন্তপূর্বক অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে তৎকালীন  শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আনছার আলীকে সভাপতি, রামচন্দ্র সাহা (ডিএসআই,সিভিল সার্জন অফিস সিরাজগঞ্জ) কে সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সেনেটারি ইন্সপেক্টর আফরোজা আক্তার সুলতানাকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি গত ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে ব্রাক চিলিং সেন্টার বাঘাবাড়ী, আব্দুল মোমেন লিমিটেড, গত ১১ সেপ্টেম্বরে  বিক্রমপুর ডেইরি লিঃ ও  প্রান ডেইরী মিল্ক থেকে পৃথকভাবে শীতলীকরণ দুধ নমুনা হিসাবে ঢাকার মহাখালীস্থ পাবলিক হেল্থ লিমিটেডে পাঠায়। সংগৃহীত নমুনা দুধ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাতে ভেজালের অস্তিত্ব প্রমানিত হওয়ায় ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত (দুর্বল) আইনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। পরে একই বছর তৎকালীন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দেওয়ান মাহমুদুল হকের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত ভেজাল দুধ বিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু করেন। ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক পরিচালিত ওই অভিযানে ব্রাকের শাহজাদপুর ও রুপবাটী ডেইরি প্রজেক্টের কর্মকর্তা সজীব কুমার ও আবুল বাশার, বাঘাবাড়ী  এ্যমোমিল্ক কোম্পানির টেকনিশিয়ান ইয়াহিয়া,  চরাচিথুলিয়া এলাকার বাচ্চুমিয়া, মেসার্স আব্দুল আলীম ট্রেডাসের্র কর্মচারী সোহাগসহ সর্বমোট ৫ জনকে  আটক করে প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইনানুসারে দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেন। সেইসাথে ভেজাল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ ড্রাম ছানার পানি উদ্ধার করে বিনষ্ট করা হয়। নামীদামী জনৈক এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওই অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা আদায়ের অপরাধে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দেওয়ান মাহমুদুল হককে তাৎক্ষনিক শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। শাস্তিমূলক বদলীর খবর সাংবাদিকরা  জানতে পেরে তারা  ‘সততার পুরষ্কার শাস্তিমূলক বদলী’-এ শিরোনামে  আবারও দুটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকায়  প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হলে  পুরষ্কার হিসাবে দেওয়ান মাহমুদুল হকের বদলী প্রত্যাহার করে  প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র সংস্থাপন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের একান্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে গত ২০০৯ সালের মার্চ মাসে শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের কায়েমপুর গ্রামে, পোরজনা ইউনিয়নের পোরজনা গ্রামে, বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর এলাকায় ও বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর দক্ষিণ পাড়সহ পাবনা সিরাজগঞ্জের দুগ্ধসমৃদ্ধ বিভিন্ন এলাকার নকল দুধ তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রচলিত আইনে জরিমানা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ভেজালকারীদের ছেড়ে দেয়। আরও পরে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিতভাবে ও আইওয়াশের লক্ষ্যে পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, ফরিদপুর, ডেমরা, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং উল্লাপাড়ার ছানা তৈরির বিভিন্ন কারখানা, মধ্যস্বত্বভোগী ও ঘোষ সম্পদায়ের বাড়িতে বাড়িতে ঝটিকা অভিযান শুরু করে স্থানীয়  প্রশাসন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগে হরিনাথপুর প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির দুধ সংগ্রহ বন্ধ করে দেয় মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ। মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ ফেরতকৃত ওই দুধ বেসরকারী একটি দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। একই বছরের ১৯ জানুয়ারি রোববার সকালে শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের পোরজনা গ্রামে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুগ্ধজাত সামগ্রী তৈরি করার অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালত ৩ দুগ্ধ ব্যবসায়ীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট রাসেল সাবরিনের নেতৃত্বে এসআই রাকিবসহ সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্সদের উপস্থিতিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত পোরজনা গ্রামের দুগ্ধ ব্যবসায়ী আশোক কুমার ঘোষকে ১০ হাজার টাকা, পলাশ কুমার ঘোষকে ১০ হাজার টাকা ও মনো ঘোষকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অপরদিকে, দুইএকদিন পরে বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে তিন ছানা প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও নকল দুধ তৈরির সরঞ্জামাদি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে এসে রোলার দিয়ে ধ্বংস করে দেয় প্রশাসন।ঘোষদের বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও তৎকালীন এ এলাকার ১৪টি বেসরকারী চিলিং পয়েন্টগুলোতে সংগৃহিত দুধে কোন ভেজাল আছে কি না তা যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও দুধের কোন নমুনা সংগ্রহ না করায় তখন জনমনে জন্ম নিয়েছিলো নান প্রশ্নের!

 

জানা গেছে, ওই সময়ে স্থানীয় প্রশাসন দু’একটি ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশের প্রচলিত আইনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুগ্ধজাত সামগ্রী প্রস্তুতের অভিযোগে যৎসামান্য জরিমানা আদায় করে কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত নকল তরল দুধ তৈরিকারীদের ছেড়ে দেন । কেমিক্যাল  ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য নানা প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিষাক্ত নকল দুধ তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তির বিধান না থাকায় আইনের ফাঁকফোঁকড় দিয়ে অসাধু ভেজাল দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা সহজেই সে সময় পার পেয়ে যায়।তারা দুই একদিন এ অপকর্ম বন্ধ রেখে ফের মাথাচারা দিয়ে ওঠে।ফলে কাজের কাজ কিছু হয়নি। এদিকে, অত্যন্ত লাভজনক ভেজাল এ ব্যবসায়ীদের যে জরিমানা করা হয় তা তাদের এক দিনেরই অবৈধ আয়েরও অনেক কম হওয়ায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দুই একদিন পর থেকে তারাই আবার কেমিক্যাল মিশ্রিত নকল ও ভেজাল দুধ তৈরির মহোৎসবে মেতে উঠে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাবার পাশাপাশি রাতারাতি কোটি কোটি অবৈধ অর্থবিত্তের মালিক বনে যায়।’

অভিজ্ঞ মহলের মতে,‘অনতিবিলম্বে দেশে প্রচলিত বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশে কেমিক্যাল দিয়ে নকল বিষাক্ত দুধ তৈরিকারীদের জন্য জরিমানার বিধানের পাশাপাশি  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আইন অনতিবিলম্বে প্রনয়ণ করা উচিত। শাহজাদপুরসহ পাবনা-সিরাজগঞ্জের গুটিকয়েক অসাধু দুগ্ধ ব্যবসায়ীর হাতে মিল্কভিটা ও দেশবাসীর জনস্বাস্থ্য  জিম্মি হোক এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। এ অপকর্ম প্রতিরোধে আশু কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করা না হলে শিশুসহ আমজনতা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হবার পাশাপাশি  পাশাপাশি তাদের জীবন ও ভবিষ্যতও বিপন্ন হতে পারে। পবিত্র রমজান মাসে যেহেতু দেশের দুধের চাহিদা বহুলাংশে বেড়ে যায় সে দিক বিবেচনায়  দুগ্ধ সমৃদ্ধ জনপদে প্রশাসনের সর্বদা নজরদারী ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা ও শিশু খাদ্য তরল দুধে ভেজালকারীদের  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে একদিকে নানা জটিল রোগবালাই থেকে দেশের শিশুসহ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা’র স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে যাবে; অন্যদিকে, তাদের জীবন ও ভবিষ্যত বিপন্নের হাত থেকে রেহাই পাবে। সেইসাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া দেশের সর্ববৃহৎ সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী  সমবায় সমিতি লিঃ মিল্কভিটাও এসব অশুভ শক্তির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে পূর্বের মতো লাভজনক ও সমৃদ্ধশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

এ বিষয়ে মিল্কভিটা’র সাবেক চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ বলেন, ‘দীর্ঘ সময় অসাধু দুগ্ধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায়ের কারখানায় নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি রোধে নিয়মিত নজরদারি ও প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা না করায় দুগ্ধশিল্পে চরম এ দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অসাধু এ চক্রকে প্রতিহত করতে অনতিবিলম্বে নিয়মিত তদারকি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেইসাথে গো-খাদ্যের মূল্য খামারীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে ও ভেজালমুক্ত গো-খাদ্য সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে করোনাকালীন সময়ের মতো বর্তমানেও এ অঞ্চলের গো-খামারীদের মাঝে অর্থিক সহযোগীতা প্রদানসহ দুগ্ধশিল্পে ভর্তুকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাহলেই দুগ্ধশিল্প ঘুরে দাঁড়াবে।

বা/খ: এসআর।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

নকল দুধের প্রভাবে দেশীয় দুগ্ধশিল্প ও জনস্বাস্থ্য চরম ঝূঁকিতে

আপডেট সময় : ০৯:৫৪:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০২৩

//শামছুর রহমান শিশির //

পবিত্র রমজান মাসে পাবনা-সিরাজগঞ্জে উৎপন্ন গরুর তরল দুধের চাহিদা সারাদেশে বহুলাংশে বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি দুধের উৎপাদন। বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ায় উৎপন্ন তরল দুধ দেশে দুধের মোট চাহিদা পূরণ করতে পারছে ন। ঘাটতি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে দিনে প্রায় দেড় লাখ লিটার। আর এই ঘাটতি পূরণের সুযোগে এক শ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু দুধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায় মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশ্রণ করে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরি করে বাড়তি চাহিদানুযায়ী ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহের মহোৎসবে মেতে উঠেছে । সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত নজরদারীর অভাবে ওই অসাধু চক্রটি ছানার টক পানি, মিল্ক পাউডার, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজ, লবন, কেমিক্যালসহ নানা ধরণের উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল ও নকল দুধ দেদারসে তৈরি করছে। এদিকে পবিত্র রমজান মাসে দেশে তরল দুধের বর্ধিত চাহিদার যোগান দিতে এ অঞ্চলের বেশকিছু মুনাফাখোর অসাধু দুধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায় নানা উপায়ে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। অসাধু চক্রটি প্রথমে টাটকা দুধ থেকে ননী তুলে ননী দিয়ে ঘি তৈরি করছে, ননী বিহীন দুধ টানা দুধ দিয়ে কেউবা নিম্নমানের ছানা তৈরি করে সেটা শারাম দুধের ছানার দামে বিক্রি করছে; আবার অনেকে ননী বিহীন টানা দুধের সাথে সোয়াবিন, চিনি ও কেমিক্যেল মিশিয়ে দুধের ঘনত্ব তৈরি করে খাটি বা শারাম দুধের দামে বিক্রি করছে। আবার অনেকে ড্রামকে ড্রাম ছানার টক পানি সংরক্ষণ করে সেই পানির সাথে ফরমালিন, কাটিং ওয়েলসহ মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে ভেজাল ও নকল তরল দুধ তৈরি করে দুধের বর্ধিত চাহিদা পূরণে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করছে। নানা অসাধু উপায়ে দুধে ভেজালকারী ওই চক্রটি এক দুধ তিন-চারবার বিক্রি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন। দেশের সর্ববৃহত সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী  সমবায় সমিতি লিমিটেড-‘মিল্কভিটা’ ও এ অঞ্চলের বিভিন্ন বেসরকারি ডেইরি প্রজেক্ট কর্তৃক নির্ধারিত প্রতি লিটার দুধের দামের চেয়ে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরিকারী চক্রটি অবৈধ পন্থায় উপার্জিত বিপুল অবৈধ অর্থের দাপটে রমজানে গো-খামারীদের দুধের দাম লিটারপ্রতি বেশী দিয়ে দুধ ক্রয় করে তার সাথে ভেজাল মিশ্রণ করে অতিরিক্ত চাহিদার এক দেড় লাখ লিটার নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে ঢাকাসহ সারাদেশে সরবরাহ করছে। এতে, এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত নকল ও ভেজাল দুধ খেয়ে দেশের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে নানান জটিল রোগে; তাদের জীবন ও ভবিষ্যত বিপন্ন হতে চলেছে। অন্যদিকে, ভেজালকারীদের অবৈধ ও অনৈতিক দৌরাত্ব আর দাপটে দুগ্ধ ব্যবসায়ের ভরা মৌসুমে মিল্কভিটার বাঘাবাড়ি ও মোহনপুর কারখানায় দুধ সংগ্রহের হার আশংকাজনক হারে কমে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে মিল্কভিটা! গত ২০০৮ সালের পর দু’এক বছর নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের কোনঠাঁসা করলেও গত প্রায় ১ যুগে নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারী অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবস্থা নেয়নি কেউ। ফলে ভেজালকারীদের সংখ্যা ও দৌরাত্ব শংকাজনক হারে বেড়েছে।

জানা যায়, স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর উত্তর পাশে স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্কভিটা) এর প্রধান কারখানা। মিল্কভিটা’কে কেন্দ্র করে বাঘাবাড়ি মিল্কশেড এরিয়ায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৪২ সহস্রাধিক গো-খামার। এসব গো-খামারে প্রতিদিন গড়ে চার লাখ লিটার দুধ উৎপন্ন হয়। এছাড়া বাঘাবাড়ি মিল্কসেড এরিয়ার পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই গাভী লালন-পালন করা হয়। এসব গাভী থেকেও দৈনিক আরো প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ লিটার দুধ পাওয়া যায়। দৈনিক উৎপন্ন পাঁচ থেকে শোয়া পাঁচ লাখ লিটার গরুর দুধ মিল্কভিটা’সহ বেসরকারি নানা ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টার, ঘোষ সম্প্রদায়সহ মধ্যস্বত্বভোগীতের কাছে খামারিরা বিক্রি করে আসছেন।

দেশের দুগ্ধশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু এ অঞ্চলে প্রাণ, আকিজ, আফতাব, ব্রাক ফুড (আড়ং), ফ্রেস মিল্ক, নাভানা মিল্ক, আমোফ্রেস মিল্ক, কোয়ালিটি, বিক্রমপুরসহ বেশ কিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করতে এ অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক ও শাখা দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে। এর ফলে তরল দুধ সংগ্রহের পরিমান দিন দিন বাড়তে থাকে। কিন্তু বাড়েনি দুধের উৎপাদন। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোর অঞ্চল (বাঘাবাড়ি মিল্কসেড এরিয়া) এর হাজার হাজার পরিবার তাদের জীবিকার পথ হিসেবে গাভী পালন ও দুধের ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার গো-খামার। এদিকে দুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ছানা উৎপাদক ও অসাধু বেশ কিছু দুধ ব্যবসায়ীরা নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে বেসরকারী নানা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্রি করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছেন।ভেজালকারীদের অবৈধ এ ব্যবসার রাতারাতি প্রবৃদ্ধি দেখে অনেকেই ভেজাল ও নকল দুধ তৈরির কারবারে উৎসাহিত  ও জড়িয়ে পড়েছেন ।

 

সিরাজগঞ্জ ও পাবনা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রমজান মাসে দেশে দৈনিক দুধের চাহিদা এক লাখ লিটার বৃদ্ধি পেয়ে সাড়ে সাত লাখ লিটারে দাঁড়িয়েছে । কিন্তু এ অঞ্চলে প্রতিদিন দুধ উৎপন্ন হচ্ছে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার। ৮-৯ মাস আগেও বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা এক লাখ থেকে এক লাখ বিশ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করতো। দুধের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা, প্রাণ ডেইরি (পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর) দেড় লাখ লিটার, পৌণে দুই লাখ লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, আমোফ্রেস মিল্ক, ব্রাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা এক লাখ লিটার, তিন শতাধিক মিষ্টির দোকানে ৪০ হাজার লিটার, রমজান মাসে হাট-বাজারে স্থানীয় ক্রেতারা প্রায় ৯০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করে থাকেন। এ হিসেবে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি পড়ে দেড় লাখ লিটারেরও বেশি।

অসাধু ব্যবসায়ীরা ছানার টক পানি, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডার, ফরমালিন, সোডা, সয়াবিন, কেমিক্যালসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরি করে নানা স্থানে সরবরাহের মাধ্যমে দুধের ওই বিশাল ঘাটতি পূরণ করছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কেবলমাত্র,  মিল্কভিটা’র কারখানায় বিশ্বের সর্বাধিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ‘মিরিস মিল্ক এ্যানালাইজার’ দিয়ে দুধের সতেজতা ও গুণগত মান পরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকায় মিল্কভিটা’য় ভেজাল ও নকল দুধ সরবরাহের কোন সুযোগ নেই। তারপরেও সমবায়ী গো-খামারিদের কারো দুধে যদি ভেজাল ধরা পড়ে তাহলে তার সদস্যপদ বাতিলসহ তার বিরুদ্ধে  কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় মিল্কভিটা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও কাজীপুর উপজেলার ঘোষ সম্প্রদায় ও দুধ ব্যবসায়ীদের শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার দুধের ছানা তৈরি করা হয়। এসব কারখানায় অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে নিমিষেই দুধ থেকে শতভাগ ননী (ফ্যাট) বের করে নেয়া হয়। পরে ওই ননী বিহীন দুধ (টানা দুধ) জ্বালিয়ে তাতে ময়দা মিশিয়ে নিন্মমানের ছানা (টানা দুধের ছানা) তৈরি করে তা উৎকৃষ্ট ও খাঁটি ছানা (শারাম দুধের ছানা) হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়। আবার এসব কারখানায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ননী বিহীন টানা দুধের সাথে চিনি, সোয়াবিন তেল, জ্বাল দেয়া তরল আটা ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশিয়ে দুধের কৃত্রিম ঘনত্ব প্রস্তুত করে বিভিন্ন বেসরকারি ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টারের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহযোগীতায় লিটারপ্রতি কমিশন বাণিজের ভিত্তিতে শতভাগ ননী বিহীন ভেজাল দুধকে ননীযুক্ত শতভাগ টাটকা দুধ হিসেবে খাঁটি দুধের দামেই অসাধু উপায়ে চালিয়ে দিয়ে প্রতিদিন মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

আবার, এসব কারখানার মালিক অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ছানার টক পানি ফেলে না দিয়ে ‘টক পানি ছাড়া ছানা কাটা সম্ভব নয়’-এমন অজুহাতে তা বড় বড় ড্রামে সংরক্ষণ করে রাখে। পরে ওই ছানার পানির সাথে ফরমালিন, কাটিং ওয়েলসহ মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে তারা তৈরি করে ভেজাল ও নকল তরল দুধ। এ দুধের সাথে চিনি ও সয়াবিন তেল মেশানোর ফলে দুধের ফ্যাট ল্যাকটোমিটারে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি প্রদর্শণ করে। যে কারণে কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল ও নকল দুধ বিক্রিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের কোন বেগই পোহাতে হচ্ছে না! অনেকে আবার মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের পাউডার গুঁড়ো দুধ জ্বাল দিয়ে তা খাঁটি দুধ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, রমজান মাসে সারাদেশে দুধের চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেলেও সে চাহিদার অনুপাতে এ অঞ্চলে বাড়েনি দুধ উৎপন্নের হার। আর এ সুযোগে এ অঞ্চলের কিছু আসাধু দুধ ব্যবসায়ী ও ঘোষেরা নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি করে স্থানীয় বেসরকারি কতিপয় ডেইরি প্রজেক্টের কুলিং সেন্টারসহ ও পরিবহনযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছে। আর ঢাকাসহ অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী জেলাগুলোতে দুধ পরিবহনের ক্ষেত্রে অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা দুধে ফরমালিন মিশিয়ে দিচ্ছে। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা এসব বিষাক্ত দুধ টাটকাই থেকে যাচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা গেছে, তারা প্রতি মন ছানার পানিতে আধা কেজি ননী, আধা কেজি স্কিমমিল্ক পাউডার সামান্য পরিমান লবন, খাবার সোডা, এক কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি (এসেন্স) মিশিয়ে অবিকল দুধ তৈরি করছে, যা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া আসল না নকল তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কতিপয় অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই ভেজাল ও নকল দুধ সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা লিটার প্রতি কমিশন নিয়ে টাটকা খাঁটি দুধ হিসেবে বেসরকারি দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে ঢুকিয়ে দিতে সহযোগীতা করছে। এসব দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে নকল দুধের সাথে খাঁটি দুধ মেশানোর ফলে সব দুধই ভেজালে পরিণত হচ্ছে। তাছাড়া, এসব অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা দুধকে সতেজ রাখতে মানবদেহের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর ফরমালিন ব্যবহার করছে। তাছাড়া, দুধ থেকে শতভাগ ফ্যাট (ননী) বের করে নেয়ার ফলে দুধের পুষ্টিমানও কমে যাচ্ছে। আর এ দুধ বেশি দামে কিনেও অজান্তেই ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। দেখার কেউ নেই।

ছানার পানি ছাড়াও অন্য এক পদ্ধতিতে অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা নকল দুধ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক মন ফুটন্ত পানিতে আধা কেজি দুধের ননী, আধা কেজি স্কিমমিল্ক পাউডার, কয়েক ফোঁটা কাটার অয়েল, ২৫০ গ্রাম হাইড্রোজ, সমপরিমান লবন, ৫০০ গ্রাম সয়াবিন তেল ও এক ফোঁটা ফরমালিন মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। ক্ষতিকর স্কিমমিল্ক পাউডার ভারত থেকে সীমান্ত পথে দেশে প্রবেশ করছে। সূত্র আরও জানায়, দুধের ল্যাকটো ও ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল সনাক্ত করা হয় বলে নকল ও ভেজাল দুধে চিনি, লবন, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয়। এতে দুধের ঘনত্ব ও ল্যাকটো বেড়ে যাওয়ার ফলে ল্যাকটোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে ভেজাল সনাক্ত সম্ভব হয়না। তাছাড়া, এসব ভেজাল তরল দুধ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহকালে যেনো নষ্ট না হয় সেজন্য দীর্ঘসময় দুধ সতেজ রাখতে মেশানো হয় ফরমালিন। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় ল্যাকটোমিটার দিয়ে অসাধু এসব দুধ ব্যবসায়ীদের সুক্ষ্ম প্রতারণা ধরা সম্ভব হয় না।

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ির খামারি মোঃ জাকির হোসেন বলেন, গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সে তুলানায় দুধের দাম বাড়েনি। দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ দশমিক ৫০ স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাটের (ননী যুক্ত) দুধ প্রতি লিটার ৫০-৫১ টাকা দরে কিনছে। এই মানের দুধ খুব কম উৎপন্ন হয়। খোলা বাজারে প্রতিলিটার দুধ ৬৫-৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ গো-খামারি দাদন নেয়ায় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম দামে দুধ সরবরাহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে, অব্যাহত লোকসানে অনেক খামারিরা গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, তার খামারে শতাধিক গরু ছিল। এখন মাত্র ৩-৪টি গাভী আছে। তাদের দুগ্ধ সমিতিতে আগে ৪৩-৪৪ ক্যান দুধ হতো। এখন মাত্র ৩-৪ ক্যান দুধ পাওয়া যায়। তার মতো অনেকে খামারি গরু বিক্রি করে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। তাদের কাছে এক সময়ের সম্ভাবনাময় দুগ্ধ শিল্প এখন লাভজনক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নাভানা মিল্কের ব্যবস্থাপক জগলুল হায়দার জানান, দুধ শুধু আমরাই নয়, আড়ং, আকিজ, আমোমিল্ক, আফতাব, মিল্কভিটাসহ অন্যান্য কোম্পানি সংগ্রহ করে থাকে। তবে তাদের দুধ সংগ্রহ পদ্ধতি শতভাগ ভেজালমুক্ত। তারা সরাসরি গো-খামারী ও ব্যবসায়দের কাছ থেকে কোম্পানির নিজস্ব কর্মচারী দ্বারা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক পরীক্ষায় ভেজালমুক্ত নিশ্চিত হয়ে তবেই দুধ সংগ্রহ করে থাকেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যাপক ডাঃ মোঃ জামাল হায়দার চৌধুরী জানান, কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল দুধ দীর্ঘদিন পান করলে মানবদেহে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে হেপাটোটক্সিকিটি বা লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডারের ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যকার দুরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যাথা অনুভব, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

 

বিজ্ঞমহলের মতে, পবিত্র রমজান মাসে দেশে দুধের বর্ধিত চাহিদাকে পুঁজি করে এ অঞ্চলের কতিপয় নকল ও ভেজাল দুধ ব্যবসায়ীরা জনস্বাস্থ্যকে জিম্মি করে বিপুল অবৈধ অর্থবিত্তের মালিক হলেও কেমিক্যাল মিশ্রিত এসব ভেজাল দুধ পান করায় দেশের শিশুসহ আমজনতা আক্রান্ত হচ্ছে নানা জটিল রোগে। তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে চলেছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে দু’একজন ভেজাল দুধ ব্যবসায়ীকে অর্থদন্ড দেয়ার খবর পাওয়া গেলেও তা ‘গুরু পাপে লঘু দন্ড’র মতোই বিবেচিত হওয়ায় কোনভাবেই নকল ও ভেজাল দুধ তৈরিকারী অসাধু ব্যবসায়ীদে্র দৌড়াত্ব রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশবাসীর জনস্বাস্থ্য জিম্মিকারী অসাধু এসব দুধ ব্যবসায়ীদের ‘গুরু পাপে গুরু দন্ড’র মতোই কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে ভবিষ্যতে এদের দৌড়াত্ব আরও বেড়ে যাবে ; সেইসাথে সম্ভব হবে না নকল ও ভেজাল দুধের ভোক্তা শিশুসহ আমজনতার স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টিও।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০০৮ সালের ১০ আগষ্ট একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকায় ‘পাবনা সিরাজগঞ্জে নামীদামী ব্রান্ডের আকর্ষণীয় মোড়কে প্যাকেটজাত নকল তরল দুধে বাজার সয়লাব; শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে জটিল রোগে: তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ  বিপন্ন হতে চলেছে’ এ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশবাসী সর্বপ্রথম নকল ও ভেজাল তরল দুধ সম্পর্কে জানতে পারে। ওই সংবাদ প্রকাশিত হবার পর জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র দৃষ্টিগোচর হয়। পরে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি তদন্তপূর্বক অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হয়। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে তৎকালীন  শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আনছার আলীকে সভাপতি, রামচন্দ্র সাহা (ডিএসআই,সিভিল সার্জন অফিস সিরাজগঞ্জ) কে সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সেনেটারি ইন্সপেক্টর আফরোজা আক্তার সুলতানাকে সদস্য সচিব করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি গত ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে ব্রাক চিলিং সেন্টার বাঘাবাড়ী, আব্দুল মোমেন লিমিটেড, গত ১১ সেপ্টেম্বরে  বিক্রমপুর ডেইরি লিঃ ও  প্রান ডেইরী মিল্ক থেকে পৃথকভাবে শীতলীকরণ দুধ নমুনা হিসাবে ঢাকার মহাখালীস্থ পাবলিক হেল্থ লিমিটেডে পাঠায়। সংগৃহীত নমুনা দুধ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তাতে ভেজালের অস্তিত্ব প্রমানিত হওয়ায় ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত (দুর্বল) আইনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। পরে একই বছর তৎকালীন শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দেওয়ান মাহমুদুল হকের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত ভেজাল দুধ বিরোধী অভিযান পরিচালনা শুরু করেন। ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক পরিচালিত ওই অভিযানে ব্রাকের শাহজাদপুর ও রুপবাটী ডেইরি প্রজেক্টের কর্মকর্তা সজীব কুমার ও আবুল বাশার, বাঘাবাড়ী  এ্যমোমিল্ক কোম্পানির টেকনিশিয়ান ইয়াহিয়া,  চরাচিথুলিয়া এলাকার বাচ্চুমিয়া, মেসার্স আব্দুল আলীম ট্রেডাসের্র কর্মচারী সোহাগসহ সর্বমোট ৫ জনকে  আটক করে প্রচলিত সংশ্লিষ্ট আইনানুসারে দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেন। সেইসাথে ভেজাল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ ড্রাম ছানার পানি উদ্ধার করে বিনষ্ট করা হয়। নামীদামী জনৈক এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওই অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা আদায়ের অপরাধে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট দেওয়ান মাহমুদুল হককে তাৎক্ষনিক শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। শাস্তিমূলক বদলীর খবর সাংবাদিকরা  জানতে পেরে তারা  ‘সততার পুরষ্কার শাস্তিমূলক বদলী’-এ শিরোনামে  আবারও দুটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকায়  প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হলে  পুরষ্কার হিসাবে দেওয়ান মাহমুদুল হকের বদলী প্রত্যাহার করে  প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র সংস্থাপন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের একান্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে গত ২০০৯ সালের মার্চ মাসে শাহজাদপুর উপজেলা প্রশাসন উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের কায়েমপুর গ্রামে, পোরজনা ইউনিয়নের পোরজনা গ্রামে, বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর এলাকায় ও বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর দক্ষিণ পাড়সহ পাবনা সিরাজগঞ্জের দুগ্ধসমৃদ্ধ বিভিন্ন এলাকার নকল দুধ তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রচলিত আইনে জরিমানা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ভেজালকারীদের ছেড়ে দেয়। আরও পরে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিতভাবে ও আইওয়াশের লক্ষ্যে পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, ফরিদপুর, ডেমরা, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং উল্লাপাড়ার ছানা তৈরির বিভিন্ন কারখানা, মধ্যস্বত্বভোগী ও ঘোষ সম্পদায়ের বাড়িতে বাড়িতে ঝটিকা অভিযান শুরু করে স্থানীয়  প্রশাসন। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভেজাল দুধ সরবরাহের অভিযোগে হরিনাথপুর প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির দুধ সংগ্রহ বন্ধ করে দেয় মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ। মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ ফেরতকৃত ওই দুধ বেসরকারী একটি দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। একই বছরের ১৯ জানুয়ারি রোববার সকালে শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের পোরজনা গ্রামে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুগ্ধজাত সামগ্রী তৈরি করার অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালত ৩ দুগ্ধ ব্যবসায়ীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট রাসেল সাবরিনের নেতৃত্বে এসআই রাকিবসহ সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্সদের উপস্থিতিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত পোরজনা গ্রামের দুগ্ধ ব্যবসায়ী আশোক কুমার ঘোষকে ১০ হাজার টাকা, পলাশ কুমার ঘোষকে ১০ হাজার টাকা ও মনো ঘোষকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অপরদিকে, দুইএকদিন পরে বাঘাবাড়ী বড়াল নদীর দক্ষিণ পার্শ্বে তিন ছানা প্রস্তুতকারী ব্যবসায়ীকে জরিমানা ও নকল দুধ তৈরির সরঞ্জামাদি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে এসে রোলার দিয়ে ধ্বংস করে দেয় প্রশাসন।ঘোষদের বাড়ীতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও তৎকালীন এ এলাকার ১৪টি বেসরকারী চিলিং পয়েন্টগুলোতে সংগৃহিত দুধে কোন ভেজাল আছে কি না তা যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও দুধের কোন নমুনা সংগ্রহ না করায় তখন জনমনে জন্ম নিয়েছিলো নান প্রশ্নের!

 

জানা গেছে, ওই সময়ে স্থানীয় প্রশাসন দু’একটি ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশের প্রচলিত আইনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দুগ্ধজাত সামগ্রী প্রস্তুতের অভিযোগে যৎসামান্য জরিমানা আদায় করে কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত নকল তরল দুধ তৈরিকারীদের ছেড়ে দেন । কেমিক্যাল  ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য নানা প্রক্রিয়ায় প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিষাক্ত নকল দুধ তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তির বিধান না থাকায় আইনের ফাঁকফোঁকড় দিয়ে অসাধু ভেজাল দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা সহজেই সে সময় পার পেয়ে যায়।তারা দুই একদিন এ অপকর্ম বন্ধ রেখে ফের মাথাচারা দিয়ে ওঠে।ফলে কাজের কাজ কিছু হয়নি। এদিকে, অত্যন্ত লাভজনক ভেজাল এ ব্যবসায়ীদের যে জরিমানা করা হয় তা তাদের এক দিনেরই অবৈধ আয়েরও অনেক কম হওয়ায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দুই একদিন পর থেকে তারাই আবার কেমিক্যাল মিশ্রিত নকল ও ভেজাল দুধ তৈরির মহোৎসবে মেতে উঠে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাবার পাশাপাশি রাতারাতি কোটি কোটি অবৈধ অর্থবিত্তের মালিক বনে যায়।’

অভিজ্ঞ মহলের মতে,‘অনতিবিলম্বে দেশে প্রচলিত বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশে কেমিক্যাল দিয়ে নকল বিষাক্ত দুধ তৈরিকারীদের জন্য জরিমানার বিধানের পাশাপাশি  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আইন অনতিবিলম্বে প্রনয়ণ করা উচিত। শাহজাদপুরসহ পাবনা-সিরাজগঞ্জের গুটিকয়েক অসাধু দুগ্ধ ব্যবসায়ীর হাতে মিল্কভিটা ও দেশবাসীর জনস্বাস্থ্য  জিম্মি হোক এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। এ অপকর্ম প্রতিরোধে আশু কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করা না হলে শিশুসহ আমজনতা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হবার পাশাপাশি  পাশাপাশি তাদের জীবন ও ভবিষ্যতও বিপন্ন হতে পারে। পবিত্র রমজান মাসে যেহেতু দেশের দুধের চাহিদা বহুলাংশে বেড়ে যায় সে দিক বিবেচনায়  দুগ্ধ সমৃদ্ধ জনপদে প্রশাসনের সর্বদা নজরদারী ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা ও শিশু খাদ্য তরল দুধে ভেজালকারীদের  দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে একদিকে নানা জটিল রোগবালাই থেকে দেশের শিশুসহ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা’র স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমে যাবে; অন্যদিকে, তাদের জীবন ও ভবিষ্যত বিপন্নের হাত থেকে রেহাই পাবে। সেইসাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া দেশের সর্ববৃহৎ সমবায়ী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী  সমবায় সমিতি লিঃ মিল্কভিটাও এসব অশুভ শক্তির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে পূর্বের মতো লাভজনক ও সমৃদ্ধশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

এ বিষয়ে মিল্কভিটা’র সাবেক চেয়ারম্যান হাসিব খান তরুণ বলেন, ‘দীর্ঘ সময় অসাধু দুগ্ধ ব্যবসায়ী, মধ্যসত্বভোগী ও ঘোষ সম্প্রদায়ের কারখানায় নকল ও ভেজাল দুধ তৈরি রোধে নিয়মিত নজরদারি ও প্রশাসনিক অভিযান পরিচালনা না করায় দুগ্ধশিল্পে চরম এ দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অসাধু এ চক্রকে প্রতিহত করতে অনতিবিলম্বে নিয়মিত তদারকি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেইসাথে গো-খাদ্যের মূল্য খামারীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে ও ভেজালমুক্ত গো-খাদ্য সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে করোনাকালীন সময়ের মতো বর্তমানেও এ অঞ্চলের গো-খামারীদের মাঝে অর্থিক সহযোগীতা প্রদানসহ দুগ্ধশিল্পে ভর্তুকির ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তাহলেই দুগ্ধশিল্প ঘুরে দাঁড়াবে।

বা/খ: এসআর।