ঢাকা ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণ: ক্ষতিপূরণের আশায় কেটে গেল ১৮ বছর

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জুন ২০২৩
  • / ৪৬৫ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
// রাজু আহমেদ রমজান, সুনামগঞ্জ //
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণের দেড় যুগ  (১৮ বছর) পূর্ণ হলেও আজও স্বাভাবিক হয়নি এলাকার পরিবেশ। এলাকাবাসী পায়নি ক্ষতিপূরণও। কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো’র সঙ্গে সরকারের মামলা থাকায় গ্যাস উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় কোন উদ্যোগ নেই এখনো। ফলে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা গ্যাসফিল্ড এলাকার মানুষজনের দিন কাটছে হতাশার মধ্যে দিয়ে।
অন্যদিকে, প্রতিনিয়ত নানা দুর্ভোগে জীবন কাটছে আশপাশের মানুষের। কয়েক বছর আগেও স্থানীয়রা নিজস্ব প্রযুক্তিতে ঝুঁকি নিয়ে গ্যাস উত্তোলন করে ব্যবহার করছে। তবে আগের মতো বিভিন্ন স্থান দিয়ে বুদবুদ আকারে গ্যাস না বের হলেও মাটি, পানি ভয়াবহ বিস্ফোরণের চিহ্ন বহন করে চলেছে আজও। পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলের মানুষের নানা রোগ বালাই লেগেই আছে। শুধু তাই নয়, মাটির গভীরে যায় এমন কোন গাছ এখানে বাঁচে না। এলাকাবাসীর প্রয়োজনে সুপেয় পানি যোগাড় করতে হয় প্রায় কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় ওই দিন রাতেই গ্যাস ফিল্ডের প্রোডাকশন কূপের রিগ ভেঙে ২শ’ থেকে ৩শ’ ফুট ওঠানামা করছিল আগুন। এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলতে থাকা গ্যাস ফিল্ডের আগুন নিভে যায় প্রাকৃতিকভাবেই। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটেছিল একই বছরের ২৪ জুন রাত ২টার দিকে। মধ্যরাতে নাইকোর তরফ থেকে প্রথমে বিপদ সংকেত বাজানো হলে রাত ৩টায় নাইকোর পক্ষ থেকে লোকজনকে এলাকা ছেড়ে তিন কিলোমিটার দূরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। রাত সাড়ে ৩টায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূরেও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল সেদিন। দু’দফা অগ্নিকান্ডে গ্যাস ফিল্ডের তিন বিসিক গ্যাস পুড়ে যায় এবং ৫.৮৯ থেকে কমপক্ষে ৫২ বিসিক গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হওয়াসহ আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার এবং শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ি, গাছগাছালি ও হাওরের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ফয়েজুর রহমান বলেন, আগে পাইপ দিয়ে এলাকার অনেকে গ্যাস ব্যবহার করেছেন। এখন সেভাবে ব্যবহার না করা গেলেও গ্যাস উদগীরণ অব্যাহত আছে। মাটির উর্বরতা একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আশপাশের কিছু এলাকায় এখনো কোন গাছপালা জন্মায় না। বিষ্ফোরণের পর অনেকে শ্বাসকষ্ট এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, যার প্রভাব আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকাবাসী।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম একই গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, আগের মতো গ্যাস বের হচ্ছে না। কিন্তু বিষ্ফোরণের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডের আশেপাশের এলাকার পানি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে উল্লেখ করে তারা বলেন, পানীয় জলের সমস্যা আমাদের জন্য একেবারে স্থায়ী হয়ে গেছে। আর্সেনিক আর আয়রনে পানি ভরপুর। গ্রাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরের গ্রামে গিয়ে আমাদের পানি সংগ্রহ  করতে হয়। অদূর ভবিষ্যতে মনে হয় না আমরা গ্যাস ফিল্ডের আশেপাশের পানি ব্যবহার করতে পারবো না। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি উঠেছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ পায়নি বলে আক্ষেপ করেন তারা।
সুরমা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাস্টার বলেন, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০২০ সালের ৩ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো’র অদক্ষতার কারণে ২০০৫ সালে দুইবার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের জন্য নাইকো দায়ী এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আট হাজার কোটি টাকা পেতে পারে বাংলাদেশ। লন্ডনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড) এমন রায় দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নসরুল হামিদ বলেন, ২০০৩ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগে একটি চুক্তির মাধ্যমে টেংরাটিলায় গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কূপ খনন শুরু হলে গ্যাসক্ষেত্রটিতে মারাত্মক বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের ফলে গ্যাসক্ষেত্র এবং তার আশপাশের এলাকায় পরিবেশ ও জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি। দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে ওই বছরের ২৪ জুন।

নিউজটি শেয়ার করুন

টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণ: ক্ষতিপূরণের আশায় কেটে গেল ১৮ বছর

আপডেট সময় : ০৮:৪১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জুন ২০২৩
// রাজু আহমেদ রমজান, সুনামগঞ্জ //
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণের দেড় যুগ  (১৮ বছর) পূর্ণ হলেও আজও স্বাভাবিক হয়নি এলাকার পরিবেশ। এলাকাবাসী পায়নি ক্ষতিপূরণও। কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো’র সঙ্গে সরকারের মামলা থাকায় গ্যাস উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় কোন উদ্যোগ নেই এখনো। ফলে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা গ্যাসফিল্ড এলাকার মানুষজনের দিন কাটছে হতাশার মধ্যে দিয়ে।
অন্যদিকে, প্রতিনিয়ত নানা দুর্ভোগে জীবন কাটছে আশপাশের মানুষের। কয়েক বছর আগেও স্থানীয়রা নিজস্ব প্রযুক্তিতে ঝুঁকি নিয়ে গ্যাস উত্তোলন করে ব্যবহার করছে। তবে আগের মতো বিভিন্ন স্থান দিয়ে বুদবুদ আকারে গ্যাস না বের হলেও মাটি, পানি ভয়াবহ বিস্ফোরণের চিহ্ন বহন করে চলেছে আজও। পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলের মানুষের নানা রোগ বালাই লেগেই আছে। শুধু তাই নয়, মাটির গভীরে যায় এমন কোন গাছ এখানে বাঁচে না। এলাকাবাসীর প্রয়োজনে সুপেয় পানি যোগাড় করতে হয় প্রায় কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে।
জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় ওই দিন রাতেই গ্যাস ফিল্ডের প্রোডাকশন কূপের রিগ ভেঙে ২শ’ থেকে ৩শ’ ফুট ওঠানামা করছিল আগুন। এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলতে থাকা গ্যাস ফিল্ডের আগুন নিভে যায় প্রাকৃতিকভাবেই। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটেছিল একই বছরের ২৪ জুন রাত ২টার দিকে। মধ্যরাতে নাইকোর তরফ থেকে প্রথমে বিপদ সংকেত বাজানো হলে রাত ৩টায় নাইকোর পক্ষ থেকে লোকজনকে এলাকা ছেড়ে তিন কিলোমিটার দূরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। রাত সাড়ে ৩টায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূরেও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল সেদিন। দু’দফা অগ্নিকান্ডে গ্যাস ফিল্ডের তিন বিসিক গ্যাস পুড়ে যায় এবং ৫.৮৯ থেকে কমপক্ষে ৫২ বিসিক গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হওয়াসহ আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার এবং শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ি, গাছগাছালি ও হাওরের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ফয়েজুর রহমান বলেন, আগে পাইপ দিয়ে এলাকার অনেকে গ্যাস ব্যবহার করেছেন। এখন সেভাবে ব্যবহার না করা গেলেও গ্যাস উদগীরণ অব্যাহত আছে। মাটির উর্বরতা একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আশপাশের কিছু এলাকায় এখনো কোন গাছপালা জন্মায় না। বিষ্ফোরণের পর অনেকে শ্বাসকষ্ট এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, যার প্রভাব আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এলাকাবাসী।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম একই গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, আগের মতো গ্যাস বের হচ্ছে না। কিন্তু বিষ্ফোরণের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডের আশেপাশের এলাকার পানি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে উল্লেখ করে তারা বলেন, পানীয় জলের সমস্যা আমাদের জন্য একেবারে স্থায়ী হয়ে গেছে। আর্সেনিক আর আয়রনে পানি ভরপুর। গ্রাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরের গ্রামে গিয়ে আমাদের পানি সংগ্রহ  করতে হয়। অদূর ভবিষ্যতে মনে হয় না আমরা গ্যাস ফিল্ডের আশেপাশের পানি ব্যবহার করতে পারবো না। দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি উঠেছিল, কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ পায়নি বলে আক্ষেপ করেন তারা।
সুরমা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাস্টার বলেন, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছি কিন্তু এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০২০ সালের ৩ মে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো’র অদক্ষতার কারণে ২০০৫ সালে দুইবার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের জন্য নাইকো দায়ী এ জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আট হাজার কোটি টাকা পেতে পারে বাংলাদেশ। লন্ডনে বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত (ইকসিড) এমন রায় দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে নসরুল হামিদ বলেন, ২০০৩ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগে একটি চুক্তির মাধ্যমে টেংরাটিলায় গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কূপ খনন শুরু হলে গ্যাসক্ষেত্রটিতে মারাত্মক বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের ফলে গ্যাসক্ষেত্র এবং তার আশপাশের এলাকায় পরিবেশ ও জনজীবনের ব্যাপক ক্ষতি করে। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি। দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে ওই বছরের ২৪ জুন।