ঢাকা ০৩:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

চলনবিলে ২৫ লাখ কেজি সরিষা ফুলের মধু আহরিত হওয়ার সম্ভাবনা

শফিউল আযম, বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৬:৩২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / ৬৮০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল। বিলটি পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদ এটি। এই বিলটি এক সময় বছরের নয় মাস পানিতে ডুবে থাকতো। রুপ ধারণ করত সমুদ্রের মতো। পলি জমে জমে চলনবিলের আগের মতো সেই রুপ নেই। চলনবিল তার বিশাল জলরাশির ঐতিহ্য হারিয়েছে। বিলের তলা উন্মোচিত হয়েছে। এখন চলনবিলের বুকজুড়ে রবি মওসুমে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সেই সরিষার ফুল থেকে আহরিত হচ্ছে অনন্য সম্পদ মধু। চলতি মওসুমে এ অঞ্চলে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু আহরিত হবে। এই মধু ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে বলে ভ্রাম্যমান মধু সংগ্রহকারীরা জানিয়েছেন।

চলনবিলের মাঠে মাঠে চোখ জুড়ানো থোকা থোকা হলুদ ফুলের সমারোহ। মাঠগুলো যেন হলুদ চাদরে মোড়ানো। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে গেছে প্রকৃতির রুপ। প্রান্ত জুড়ে উঁকি দিচ্ছে সরিষা ফুলের দোল খাওয়া গাছ। সরিষার সবুজ গাছের হলুদ ফুল শিশির ভেজা শীতের সোনাঝরা রোদে ঝিকমিকিয়ে উঠছে। যেন প্রকৃতি সেজেছে হলুদবরণ সাজে। হলুদ রঙের আভার সাথে বাতাসে বইছে মৌ মৌ গন্ধ। মৌমাছি ব্যস্ত মধু সংগ্রহে। চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য দেখতে প্রকৃতিপ্রেমীরা সপরিবারে ভিড় করছেন মাঠে, তুলছেন ছবি।

পাবনা-নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, বেড়া, সাঁথিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ ২৬টি উপজেলায় চলতি রবি মওসুমে এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আগাম ও নাবী জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে দুই টন হিসেবে তিন লাখ টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে ছুটে চলা বনপাড়া-হাটিকুমরুল যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে মাঠের পর মাঠ দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর থোকা থোকা হলুদ ফুলের চাদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্তরেখায়। নয়নাভিরাম সেই সরিষা ক্ষেতের আলে আলে এখন শুধুই সারিসারি মৌবাক্স। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চলনবিল শুধু মাছেই নয়; মধু উৎপাদনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। এ অঞ্চলের ফসলের মাঠগুলোতে এখন সরষের হলুদ ফুলের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ জুড়ে বিরাজ করছে থোকা থোকা হলুদ ফুলের দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মধু উৎপাদনে চলনবিলে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মৌচাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসেবে এর বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। চলনবিলে প্রায় এক হাজার মৌচাষি মধু সংগ্রহে এসেছেন। আর এসব মৌচাষির সাথে শ্রমিক-কর্মচারি রয়েছেন আরো তিন-চার হাজার।

পাবনা-নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মওসুমে চলনবিলের ২৬ উপজেলায় এক লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীলসহ বিভিন্ন জাতের সরিষার চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলে মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন অন্যদিকে পরাগায়ন ভালো হওয়ায় সরিষার ফলনও বাড়ছে। প্রতিবছর অগ্রহায়ন-পৌষ-মাঘ মাসজুড়ে চলনবিলের মাঠগুলো সরিষা ফুলে ফুলে ভরে যায়। এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার মৌচাষিরা বিশাল চলনবিলের সরিষা ক্ষেতে আসেন মধু সংগ্রহের জন্য। এবছরও প্রায় এক হাজার মৌচাষি চলনবিল এলাকার সরিষা ক্ষেতে মৌ বাক্স স্থাপন করেছেন। মৌমাছিরা সরিষার ফুলে ফুলে ছুটে মধু সংগ্রহ করে মৌবাক্সে ফিরে আসছে। এক সময়ের মৎস্যভান্ডার খ্যাত চলনবিল এখন যেন ‘মধু’র ভান্ডারে পরিনত হয়েছে।

মৌচাষি সমিতি সূত্রে জানা যায়, এবার কুষ্টিয়া, চাপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা, সাতক্ষীরা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ৯৬৯ জন মৌচাষি মধূ সংগ্রহের জন্য চলনবিলের সরিষার ক্ষেতে ৮৯ হাজার ১২৫টি মৌবাক্স বসিয়েছেন। তাদের হিসাবের বাইরে আরও কিছ মৌবাক্স স্থাপিত হয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ২৫ লাখ কেজি মধু সংগ্রহ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার মধুর দাম বেশি। ফলে মধু সংগ্রহকারীরা লাভবান হবেন।

উত্তরবঙ্গ মৌচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহাদ আলী জানান, তিনি ১০০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। এ থেকে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহ হচ্ছে প্রায় ৮০ কেজি। সিরাজগঞ্জের কৃষিবিদ মোঃ মসকর আলী জানান, কৃষি বিভাগও মধু সংগ্রহে বাক্স প্রদান করেছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চলের সরিষা ফুল থেকে বাণিজ্যিকভাবে এবং বিভিন্ন গাছ-পালায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মৌচাক থেকে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু সংগৃহীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরিষা একটি স্বল্প মেয়াদী আগাম ফসল। বণ্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পরই কৃষকেরা সরিষা চাষ করেছেন। এরপর একই জমিতে ইরি-বোরো ধান আবাদ হবে। এবছর কৃষকদের সরিষা চাষে ব্যাপক সচেতন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চলতি মওসুমে সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মসকর আলী জানিয়েছেন।

চলনবিল পাড়ের আলাইপুর গ্রামের কৃষক সুশান্ত কুমার শান্ত বলেন, এবছর তিনি ৭৫ বিঘা জমিতে জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় সাত থেকে আট মণ সরিষা পাওয়ার আশা করছেন। সরিষা চাষে প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা লাভ হবে। তিনিও মৌবাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন। চলনবিল পাড়ের দলগাসা গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান বলেন, সরিষা চাষ খুবই লাভজনক। তিনি এবছর বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। তার ক্ষেতেও বসেছে মৌবাক্স। এতে সরিষার ফলন ভালো হওয়ার আশা করছেন তিনি।

চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চলনবিলে আসা মৌচাষিরা মধু আহরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মধু সংগ্রকারী ইয়াসিন কবির গোপালগঞ্জ থেকে চলনবিলে এসেছেন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার রসুলপুর যাওয়ার পথে এ প্রতিনিধিকে জানান, এবার তিনি ১৫০টি মধুর বাক্স স্তাপন করেছেন। গত বছর স্থাপন করেছিলেন ১১০টি বাক্স। সমিতিতে গতবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবার ৪০টি বাক্স বেশি স্থাপনের অনমতি পেয়েছেন। চলনবিলে মৌবাক্স স্থাপনকারী সুমান আলী জানান, তিনি ৩০০টি মৌবাক্স স্তাপন করে সপ্তাহে ৬ মণ মধু আহরণ করতে পারছেন। অনেকেই মধু কিনতে মাঠে আসছেন। তিনি বলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ৩দিনের বৃষ্টিতে অনেক মৌমাছি মারা গেছে। মৌমাছি মারা যাওয়ায় তিনি আশানুরুপ মধু সংগ্রহ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দিহান।

চলনবিল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কলমগ্রামের কৃষক রমজান আলী জানান, অন্যান্য ফসল আবাদ করে প্রতি বিঘায় যে পরিমান লাভ হয় তার চেয়ে ওই পরিমান জমিতে সরিষা চাষ করে দ্বিগুণ লাভ করা যায়। এ অঞ্চলে সরষের আবাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে মওসুমি মৌচাষিদের তৎপরতা। সরিষা যেমন দিচ্ছে তেল, সাথে দিচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এছাড়া সরিষার ফুল ও পাতা ঝরে তৈরি হয় জৈবসার। ফলে কৃষকেরা এখন ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সরিষা চাষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। পাবনার হান্ডিয়াল এলাকার কৃষক আলেক দেওয়ান জানন, তিনি পাঁচ একর জমিতে সরিষা আবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। ছয় বছর ধরে সরিষা চাষ করে তিনি প্রতি মওসুমে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। চলতি মওসুমে আরো বেশি লাভের আশা করছেন।

খুলনা থেকে চলনবিলের কলম এলাকায় মধু সংগ্রহ করতে আসা নাছির উদ্দিন বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে সে মধু আহরণ করছে। মাত্র কয়েক দিন হলো এখানে এসেছেন। গত বছর তিনি দুই টন মধু আহরণ করেছিলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন টনের বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

মৌচাষিরা জানান, বছরের সাত মাস মধু পাওয়া যায়। সরষের পর লিচু, আম, ধনিয়া, তিলসহ বিভিন্ন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, প্রতি বছর চলনবিল অঞ্চলের বির্স্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সরিষা আবাদ হয়ে থাকে। সরিষার ক্ষেতে মধুর বাক্স স্থাপনে মৌমাছি পরাগায়নে সহায়তা করে। এতে সরিষার ফলন বেড়ে যায়। চাষি ও মৌচাষি উভয়েই লাভবান হয়ে থাকেন। তিনি জানান, প্রতি বছর চলনবিল এলাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌচাষিরা আসেন। তাদের সংগৃহীত মধু পাইকাররা কিনে বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ করেন। এবার আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

চলনবিলে ২৫ লাখ কেজি সরিষা ফুলের মধু আহরিত হওয়ার সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০৬:৩২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৩

দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল। বিলটি পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও নাটোর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত। উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদ এটি। এই বিলটি এক সময় বছরের নয় মাস পানিতে ডুবে থাকতো। রুপ ধারণ করত সমুদ্রের মতো। পলি জমে জমে চলনবিলের আগের মতো সেই রুপ নেই। চলনবিল তার বিশাল জলরাশির ঐতিহ্য হারিয়েছে। বিলের তলা উন্মোচিত হয়েছে। এখন চলনবিলের বুকজুড়ে রবি মওসুমে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সেই সরিষার ফুল থেকে আহরিত হচ্ছে অনন্য সম্পদ মধু। চলতি মওসুমে এ অঞ্চলে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু আহরিত হবে। এই মধু ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে বলে ভ্রাম্যমান মধু সংগ্রহকারীরা জানিয়েছেন।

চলনবিলের মাঠে মাঠে চোখ জুড়ানো থোকা থোকা হলুদ ফুলের সমারোহ। মাঠগুলো যেন হলুদ চাদরে মোড়ানো। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলে গেছে প্রকৃতির রুপ। প্রান্ত জুড়ে উঁকি দিচ্ছে সরিষা ফুলের দোল খাওয়া গাছ। সরিষার সবুজ গাছের হলুদ ফুল শিশির ভেজা শীতের সোনাঝরা রোদে ঝিকমিকিয়ে উঠছে। যেন প্রকৃতি সেজেছে হলুদবরণ সাজে। হলুদ রঙের আভার সাথে বাতাসে বইছে মৌ মৌ গন্ধ। মৌমাছি ব্যস্ত মধু সংগ্রহে। চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য দেখতে প্রকৃতিপ্রেমীরা সপরিবারে ভিড় করছেন মাঠে, তুলছেন ছবি।

পাবনা-নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, বেড়া, সাঁথিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ ২৬টি উপজেলায় চলতি রবি মওসুমে এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আগাম ও নাবী জাতের সরিষা চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে দুই টন হিসেবে তিন লাখ টন সরিষা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে ছুটে চলা বনপাড়া-হাটিকুমরুল যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে মাঠের পর মাঠ দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর থোকা থোকা হলুদ ফুলের চাদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্তরেখায়। নয়নাভিরাম সেই সরিষা ক্ষেতের আলে আলে এখন শুধুই সারিসারি মৌবাক্স। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চলনবিল শুধু মাছেই নয়; মধু উৎপাদনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা বিলাঞ্চল। এ অঞ্চলের ফসলের মাঠগুলোতে এখন সরষের হলুদ ফুলের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ জুড়ে বিরাজ করছে থোকা থোকা হলুদ ফুলের দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। মধু উৎপাদনে চলনবিলে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মৌচাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসেবে এর বাজার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। চলনবিলে প্রায় এক হাজার মৌচাষি মধু সংগ্রহে এসেছেন। আর এসব মৌচাষির সাথে শ্রমিক-কর্মচারি রয়েছেন আরো তিন-চার হাজার।

পাবনা-নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মওসুমে চলনবিলের ২৬ উপজেলায় এক লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীলসহ বিভিন্ন জাতের সরিষার চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলে মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন অন্যদিকে পরাগায়ন ভালো হওয়ায় সরিষার ফলনও বাড়ছে। প্রতিবছর অগ্রহায়ন-পৌষ-মাঘ মাসজুড়ে চলনবিলের মাঠগুলো সরিষা ফুলে ফুলে ভরে যায়। এ সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার মৌচাষিরা বিশাল চলনবিলের সরিষা ক্ষেতে আসেন মধু সংগ্রহের জন্য। এবছরও প্রায় এক হাজার মৌচাষি চলনবিল এলাকার সরিষা ক্ষেতে মৌ বাক্স স্থাপন করেছেন। মৌমাছিরা সরিষার ফুলে ফুলে ছুটে মধু সংগ্রহ করে মৌবাক্সে ফিরে আসছে। এক সময়ের মৎস্যভান্ডার খ্যাত চলনবিল এখন যেন ‘মধু’র ভান্ডারে পরিনত হয়েছে।

মৌচাষি সমিতি সূত্রে জানা যায়, এবার কুষ্টিয়া, চাপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা, সাতক্ষীরা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার ৯৬৯ জন মৌচাষি মধূ সংগ্রহের জন্য চলনবিলের সরিষার ক্ষেতে ৮৯ হাজার ১২৫টি মৌবাক্স বসিয়েছেন। তাদের হিসাবের বাইরে আরও কিছ মৌবাক্স স্থাপিত হয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ২৫ লাখ কেজি মধু সংগ্রহ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছরের চেয়ে এবার মধুর দাম বেশি। ফলে মধু সংগ্রহকারীরা লাভবান হবেন।

উত্তরবঙ্গ মৌচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহাদ আলী জানান, তিনি ১০০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। এ থেকে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহ হচ্ছে প্রায় ৮০ কেজি। সিরাজগঞ্জের কৃষিবিদ মোঃ মসকর আলী জানান, কৃষি বিভাগও মধু সংগ্রহে বাক্স প্রদান করেছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে চলতি মওসুমে চলনবিল অঞ্চলের সরিষা ফুল থেকে বাণিজ্যিকভাবে এবং বিভিন্ন গাছ-পালায় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মৌচাক থেকে প্রায় ২৫ লাখ কেজি মধু সংগৃহীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরিষা একটি স্বল্প মেয়াদী আগাম ফসল। বণ্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পরই কৃষকেরা সরিষা চাষ করেছেন। এরপর একই জমিতে ইরি-বোরো ধান আবাদ হবে। এবছর কৃষকদের সরিষা চাষে ব্যাপক সচেতন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চলতি মওসুমে সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মসকর আলী জানিয়েছেন।

চলনবিল পাড়ের আলাইপুর গ্রামের কৃষক সুশান্ত কুমার শান্ত বলেন, এবছর তিনি ৭৫ বিঘা জমিতে জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। প্রতি বিঘায় সাত থেকে আট মণ সরিষা পাওয়ার আশা করছেন। সরিষা চাষে প্রতি বিঘায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা লাভ হবে। তিনিও মৌবাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন। চলনবিল পাড়ের দলগাসা গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান বলেন, সরিষা চাষ খুবই লাভজনক। তিনি এবছর বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। তার ক্ষেতেও বসেছে মৌবাক্স। এতে সরিষার ফলন ভালো হওয়ার আশা করছেন তিনি।

চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চলনবিলে আসা মৌচাষিরা মধু আহরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মধু সংগ্রকারী ইয়াসিন কবির গোপালগঞ্জ থেকে চলনবিলে এসেছেন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার রসুলপুর যাওয়ার পথে এ প্রতিনিধিকে জানান, এবার তিনি ১৫০টি মধুর বাক্স স্তাপন করেছেন। গত বছর স্থাপন করেছিলেন ১১০টি বাক্স। সমিতিতে গতবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবার ৪০টি বাক্স বেশি স্থাপনের অনমতি পেয়েছেন। চলনবিলে মৌবাক্স স্থাপনকারী সুমান আলী জানান, তিনি ৩০০টি মৌবাক্স স্তাপন করে সপ্তাহে ৬ মণ মধু আহরণ করতে পারছেন। অনেকেই মধু কিনতে মাঠে আসছেন। তিনি বলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের ৩দিনের বৃষ্টিতে অনেক মৌমাছি মারা গেছে। মৌমাছি মারা যাওয়ায় তিনি আশানুরুপ মধু সংগ্রহ করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সন্দিহান।

চলনবিল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কলমগ্রামের কৃষক রমজান আলী জানান, অন্যান্য ফসল আবাদ করে প্রতি বিঘায় যে পরিমান লাভ হয় তার চেয়ে ওই পরিমান জমিতে সরিষা চাষ করে দ্বিগুণ লাভ করা যায়। এ অঞ্চলে সরষের আবাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে মওসুমি মৌচাষিদের তৎপরতা। সরিষা যেমন দিচ্ছে তেল, সাথে দিচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এছাড়া সরিষার ফুল ও পাতা ঝরে তৈরি হয় জৈবসার। ফলে কৃষকেরা এখন ধান ও অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি সরিষা চাষের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। পাবনার হান্ডিয়াল এলাকার কৃষক আলেক দেওয়ান জানন, তিনি পাঁচ একর জমিতে সরিষা আবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। ছয় বছর ধরে সরিষা চাষ করে তিনি প্রতি মওসুমে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। চলতি মওসুমে আরো বেশি লাভের আশা করছেন।

খুলনা থেকে চলনবিলের কলম এলাকায় মধু সংগ্রহ করতে আসা নাছির উদ্দিন বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে সে মধু আহরণ করছে। মাত্র কয়েক দিন হলো এখানে এসেছেন। গত বছর তিনি দুই টন মধু আহরণ করেছিলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন টনের বেশি মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

মৌচাষিরা জানান, বছরের সাত মাস মধু পাওয়া যায়। সরষের পর লিচু, আম, ধনিয়া, তিলসহ বিভিন্ন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, প্রতি বছর চলনবিল অঞ্চলের বির্স্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সরিষা আবাদ হয়ে থাকে। সরিষার ক্ষেতে মধুর বাক্স স্থাপনে মৌমাছি পরাগায়নে সহায়তা করে। এতে সরিষার ফলন বেড়ে যায়। চাষি ও মৌচাষি উভয়েই লাভবান হয়ে থাকেন। তিনি জানান, প্রতি বছর চলনবিল এলাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌচাষিরা আসেন। তাদের সংগৃহীত মধু পাইকাররা কিনে বিভিন্ন কোম্পানিতে সরবরাহ করেন। এবার আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় সরিষার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।