ঢাকা ০২:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

চলনবিলে নিন্মবিত্ত হাজারও মানুষের জীবীকার অবলম্বন শামুক-ঝিনুক

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২২
  • / ৪৮৯ বার পড়া হয়েছে

চলনবিলের দিঘিবাজার এলাকায় শামুক ঝিনুক বিক্রয়ের দৃশ্য

বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শফিউল আযম, বিশেষ সংবাদদাতা :
চলনবিলের জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শামুক ও ঝিনুক জীবিকা অর্জনের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিন্মবিত্ত হাজারও মানুষের। এ অঞ্চলের কর্মহীন মানুষ আষাঢ থেকে অগ্রাহন মাস পর্যন্ত শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেখানে চাষ করা চিংড়ি মাছের খাবার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারের শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে এই অঞ্চলের মাটির উর্বরা শক্তি। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশি তৈরি করে। এতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িসহ বিস্তীর্ন জলাভূমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক বেচা-কেনার জন্য চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, সিংড়া উপজেলায় ৫০টির বেশি আরৎ গড়ে উঠেছে। সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে আড়ৎদাররা প্রতিবস্তা শামুক-ঝিনুক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীরা এসব শামুক-ঝিনুক কিনে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষিরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে প্রতিবস্তা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। চিংড়িসহ চাষ করা অন্য মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে কম খরচে খাদ্য হিসেবে শামুক-ঝিনুকের বিকল্প নেই। তাই এর চাহিদা বেশি। এ কারণে এই অঞ্চলের ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা আড়ৎদারদের কাছ থেকে শামুক ঝিনুক কিনছেন।

তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া শামুক-ঝিনুক বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার চালান। দুই ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি নিজে ও ছেলেমেয়েরা মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই বস্তা শামুক ধরেন। আয় হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। বর্ষার কর্মহীন মওসুমে এই টাকা দিয়েই চলে বড় এ পরিবারের খরচ। কলমগ্রামের দরিদ্র গৃহিনী আছমা বেগম। বৃদ্ধ স্বামী উপার্যনে অক্ষম। প্রতিদিন ঝুড়ি নিয়ে ধান ক্ষেত থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক বস্তার মতো শামুক সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। আরৎদারদের কাছে বিক্রি করে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পান। তাই দিয়ে তার বেশ ভালভাবে সংসার চলে। শামুক সংগ্রহ করে নিজের পড়ালেখার খরচসহ বিভিন্ন খরচ জোগাড় করে তাড়াশ উপজেলার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুল। অভাবের সংসারে মায়ের হাতে প্রতিদিন কিছু টাকাও তুলে দিতে পারে সে। শামুক সংগ্রহের জন্য ছোট এশটি ডিঙি নৌকা থাকলে প্রতিদিন পানিতে ভিজে হলেও তার কোন কষ্ট থাকবে না বলে জানায় সাইদুল।

ফসলের খেতে ধান, ধনচে জাতীয় যেকোন ফসল বা কঢ়ুরিপানার গায়ের ওপর ভর করে পানিতে ভেসে থাকে শামুক। জালের তৈরি ফাঁস দিয়ে পানিতে ভাসামান অবস্থায় থাকা শামুক ধরা হয়। ছোট ডিঙি নৌকা চালিয়ে এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে গিয়ে সংগ্রহ করে শামুক নৌকার মধ্যে রাখা হয়। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শামুক আহরণ শুরু হয়ে চলে অগ্রাহায়ন মাস পর্যন্ত। তবে আষাঢ, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রাহন মাস হচ্ছে শামুক ঝিনুক ধরার ভরা মওসুম। মাছ কমে যাওয়ায় কিছু জেলে পরিবার এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। খুব ভোর থেকে পানিতে ভেসে থাকা শামুক ধরা শুরু করতে হয়। কারণ রোদের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এরা পানির নিচে চলে যায়।

চলনবিলের নদী, বিল ও খাড়ির পাড়ে গড়ে উঠেছে শামুক-ঝিনুক বিক্রির অস্থায়ী বাজার। ফড়িয়ারা শামুক-ঝিনুক কিনে আড়ৎতে বিক্রি করছে। সেখান থেকে ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা শামুক ঝিনুক কিনছেন। পরে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষিরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের চাটমোহর, ভাগুড়া, উল্লাপাড়া, তাড়াশ ও সিংড়ায় প্রায় ৫০টির মতো শামুক-ঝিনুক কেনাবেচার আড়ৎ রয়েছে। প্রধান কয়েকটি আড়ৎ হলো দীঘিবাজার, মহিষলুটি, ১০ নং ব্রীজ এলাকা, হান্ডিয়াল, সাগুড়া, বিয়াস বাজার, নিমাইচড়া বাজারসহ ৫০টি এলাকায় পাইকারী শামুক-ঝিনুক বেচাকেনা চলে।
সরেজমিন মহিষলুটি, ১০ নং ব্রীজ এলাকা ও বিয়াস বাজার গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে রাখা হয়েছে শতাধিক বস্তা শামুক। ফড়িয়া ও সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক কিনে নিচ্ছেন আড়ৎদাররা। আড়ৎদারের কাছে শামুক বিক্রি করতে আসা ফড়িয়া তাড়াশ উপজেলার সাতপুকুরিয়া গ্রামের বেল্লাল হোসেন বলেন, এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েরা শামুক-ঝিনুক ধরে। অনেক গরীব মানুষ বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় শামুক ধরে বিক্রি করে। আয়াশ গ্রামের মহাজন ছালাম মিয়া বলেন, বিভিন্ন ফড়িয়ার কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক-ঝিনুক কিনে থাকি। আজ ৬০ হাজার টাকার শামুক কিনেছি। এখন ট্রাকে করে এই শামুক খুলনা পাঠাবো। শামুকের ব্যবসা কাঁচামালের মতো, প্রতিদিন অবস্থার পরিবর্তন হয়। তিনি বলেন, খুলনার বটতলা, রায়েরমহল, চিতলমারী, গুদারা ও আলমঘাটা এলাকায় নিয়ে গিয়ে এ শামুক-ঝিনুক বিক্রি করি। দক্ষিণাঞ্চলের লোনা পানিতে শামুক হয় না। তাই আমাদের এই অঞ্চলের শামুকের বেশ চাহিদা রয়েছে। এই শামুক ভেঙে ভেতরের অংশ বিভিন্ন খামারে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, চলনবিল অঞ্চলের জলাভূমির শামুক-ঝিনুক অনেক কিছুরই খাবার। ব্যাপক হারে শামুক নিধন জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলাও নষ্ট করে। যে শামুকগুলো বর্ষার শেষে মাটিতে বসে তা সেখানেই পচে সার হয়। জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের জোগান দেয়। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে যেসব শামুক ধরা হয়, তা মুলত অ্যাপেল স্নেইল  (আপেল শামুক) গোত্রের। এই শামুক ধরে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের যে চিংড়িকে খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো আমাদের দেশের মানুষ পাচ্ছে না। প্রতিদিন চলনবিল থেকে প্রায় ১০০ টন শামুক ধরা হচ্ছে। নিবিচারে শামুক নিধনের ফলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইফুল আলম বলেন, যেকোন মৃতজীবের অবশিষ্ট অংশ পচে-গলে জৈব সার হয়। তেমনি এ অঞ্চলের শামুক শুকনো মওসুমে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আবার ফসলের জমিতে অতিরিক্ত শামুক হলেও তা ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমাদের এই শামুক প্রাকৃতিক সম্পদ। আমার জানা মতে, এ অঞ্চল থেকে নিয়ে যাওয়া শামুকের ভেতরের অংশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খোলস ব্যবহার হয় চুন ও সার তৈরিতে। তবে নির্বিচারে শামুক নিধন এই অঞ্চলের জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ও খাদ্যশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর। এটি নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন

চলনবিলে নিন্মবিত্ত হাজারও মানুষের জীবীকার অবলম্বন শামুক-ঝিনুক

আপডেট সময় : ০৮:৫৯:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২২

শফিউল আযম, বিশেষ সংবাদদাতা :
চলনবিলের জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শামুক ও ঝিনুক জীবিকা অর্জনের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিন্মবিত্ত হাজারও মানুষের। এ অঞ্চলের কর্মহীন মানুষ আষাঢ থেকে অগ্রাহন মাস পর্যন্ত শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেখানে চাষ করা চিংড়ি মাছের খাবার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারের শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে এই অঞ্চলের মাটির উর্বরা শক্তি। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশি তৈরি করে। এতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িসহ বিস্তীর্ন জলাভূমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক বেচা-কেনার জন্য চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, সিংড়া উপজেলায় ৫০টির বেশি আরৎ গড়ে উঠেছে। সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে আড়ৎদাররা প্রতিবস্তা শামুক-ঝিনুক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীরা এসব শামুক-ঝিনুক কিনে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষিরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে প্রতিবস্তা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছে। চিংড়িসহ চাষ করা অন্য মাছ দ্রুত বৃদ্ধিতে কম খরচে খাদ্য হিসেবে শামুক-ঝিনুকের বিকল্প নেই। তাই এর চাহিদা বেশি। এ কারণে এই অঞ্চলের ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা আড়ৎদারদের কাছ থেকে শামুক ঝিনুক কিনছেন।

তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া শামুক-ঝিনুক বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার চালান। দুই ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি নিজে ও ছেলেমেয়েরা মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই বস্তা শামুক ধরেন। আয় হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। বর্ষার কর্মহীন মওসুমে এই টাকা দিয়েই চলে বড় এ পরিবারের খরচ। কলমগ্রামের দরিদ্র গৃহিনী আছমা বেগম। বৃদ্ধ স্বামী উপার্যনে অক্ষম। প্রতিদিন ঝুড়ি নিয়ে ধান ক্ষেত থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক বস্তার মতো শামুক সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। আরৎদারদের কাছে বিক্রি করে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পান। তাই দিয়ে তার বেশ ভালভাবে সংসার চলে। শামুক সংগ্রহ করে নিজের পড়ালেখার খরচসহ বিভিন্ন খরচ জোগাড় করে তাড়াশ উপজেলার ভেটুয়া গ্রামের কিশোর সাইদুল। অভাবের সংসারে মায়ের হাতে প্রতিদিন কিছু টাকাও তুলে দিতে পারে সে। শামুক সংগ্রহের জন্য ছোট এশটি ডিঙি নৌকা থাকলে প্রতিদিন পানিতে ভিজে হলেও তার কোন কষ্ট থাকবে না বলে জানায় সাইদুল।

ফসলের খেতে ধান, ধনচে জাতীয় যেকোন ফসল বা কঢ়ুরিপানার গায়ের ওপর ভর করে পানিতে ভেসে থাকে শামুক। জালের তৈরি ফাঁস দিয়ে পানিতে ভাসামান অবস্থায় থাকা শামুক ধরা হয়। ছোট ডিঙি নৌকা চালিয়ে এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে গিয়ে সংগ্রহ করে শামুক নৌকার মধ্যে রাখা হয়। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শামুক আহরণ শুরু হয়ে চলে অগ্রাহায়ন মাস পর্যন্ত। তবে আষাঢ, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রাহন মাস হচ্ছে শামুক ঝিনুক ধরার ভরা মওসুম। মাছ কমে যাওয়ায় কিছু জেলে পরিবার এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। খুব ভোর থেকে পানিতে ভেসে থাকা শামুক ধরা শুরু করতে হয়। কারণ রোদের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এরা পানির নিচে চলে যায়।

চলনবিলের নদী, বিল ও খাড়ির পাড়ে গড়ে উঠেছে শামুক-ঝিনুক বিক্রির অস্থায়ী বাজার। ফড়িয়ারা শামুক-ঝিনুক কিনে আড়ৎতে বিক্রি করছে। সেখান থেকে ঘেরের মালিক ও ব্যবসায়ীরা শামুক ঝিনুক কিনছেন। পরে ট্রাকে করে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষিরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলের চাটমোহর, ভাগুড়া, উল্লাপাড়া, তাড়াশ ও সিংড়ায় প্রায় ৫০টির মতো শামুক-ঝিনুক কেনাবেচার আড়ৎ রয়েছে। প্রধান কয়েকটি আড়ৎ হলো দীঘিবাজার, মহিষলুটি, ১০ নং ব্রীজ এলাকা, হান্ডিয়াল, সাগুড়া, বিয়াস বাজার, নিমাইচড়া বাজারসহ ৫০টি এলাকায় পাইকারী শামুক-ঝিনুক বেচাকেনা চলে।
সরেজমিন মহিষলুটি, ১০ নং ব্রীজ এলাকা ও বিয়াস বাজার গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে রাখা হয়েছে শতাধিক বস্তা শামুক। ফড়িয়া ও সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক কিনে নিচ্ছেন আড়ৎদাররা। আড়ৎদারের কাছে শামুক বিক্রি করতে আসা ফড়িয়া তাড়াশ উপজেলার সাতপুকুরিয়া গ্রামের বেল্লাল হোসেন বলেন, এলাকার দরিদ্র ছেলেমেয়েরা শামুক-ঝিনুক ধরে। অনেক গরীব মানুষ বর্ষার দিনে কাজ না থাকায় শামুক ধরে বিক্রি করে। আয়াশ গ্রামের মহাজন ছালাম মিয়া বলেন, বিভিন্ন ফড়িয়ার কাছ থেকে বস্তা হিসেবে শামুক-ঝিনুক কিনে থাকি। আজ ৬০ হাজার টাকার শামুক কিনেছি। এখন ট্রাকে করে এই শামুক খুলনা পাঠাবো। শামুকের ব্যবসা কাঁচামালের মতো, প্রতিদিন অবস্থার পরিবর্তন হয়। তিনি বলেন, খুলনার বটতলা, রায়েরমহল, চিতলমারী, গুদারা ও আলমঘাটা এলাকায় নিয়ে গিয়ে এ শামুক-ঝিনুক বিক্রি করি। দক্ষিণাঞ্চলের লোনা পানিতে শামুক হয় না। তাই আমাদের এই অঞ্চলের শামুকের বেশ চাহিদা রয়েছে। এই শামুক ভেঙে ভেতরের অংশ বিভিন্ন খামারে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, চলনবিল অঞ্চলের জলাভূমির শামুক-ঝিনুক অনেক কিছুরই খাবার। ব্যাপক হারে শামুক নিধন জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলাও নষ্ট করে। যে শামুকগুলো বর্ষার শেষে মাটিতে বসে তা সেখানেই পচে সার হয়। জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের জোগান দেয়। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে যেসব শামুক ধরা হয়, তা মুলত অ্যাপেল স্নেইল  (আপেল শামুক) গোত্রের। এই শামুক ধরে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের যে চিংড়িকে খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো আমাদের দেশের মানুষ পাচ্ছে না। প্রতিদিন চলনবিল থেকে প্রায় ১০০ টন শামুক ধরা হচ্ছে। নিবিচারে শামুক নিধনের ফলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাইফুল আলম বলেন, যেকোন মৃতজীবের অবশিষ্ট অংশ পচে-গলে জৈব সার হয়। তেমনি এ অঞ্চলের শামুক শুকনো মওসুমে মাটির সঙ্গে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আবার ফসলের জমিতে অতিরিক্ত শামুক হলেও তা ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমাদের এই শামুক প্রাকৃতিক সম্পদ। আমার জানা মতে, এ অঞ্চল থেকে নিয়ে যাওয়া শামুকের ভেতরের অংশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খোলস ব্যবহার হয় চুন ও সার তৈরিতে। তবে নির্বিচারে শামুক নিধন এই অঞ্চলের জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি ও খাদ্যশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর। এটি নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি জানান।