ঢাকা ১১:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

ঘূর্ণিঝড় রিমালে কাইড়্যা নিল আমাগো ঈদ আনন্দ

শাহজাহান সিরাজ, কয়রা প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৬:৪১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪
  • / ৪১৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাত পোহালেই ঈদ, আমাগো কপালে কি আর ঈদ আছে ? তিনবেলা খাবার জুটতেছে না, তাই ঈদ নেই কোন ভাবনা নি। কোন জাগা থেকে কিছু পালি ছাবাল-মেয়ে দুটোর মুখি দে ঈদ এর দিনডা কাটাই দেবানে। বেটা অসুস্থ বেকার পইড়া আছে। আমিও বেটার সাথে নদীতে মাছ ধরি। ঝড়ের পরে নদীতে মাছ শাক পাওন যাচ্ছে না। ছাওয়ালের কাপড় দিমু ক্যামনে ? খাওনের পয়সা নাই, আর টাকা। যদি কোন সংগঠনের আফারা আইস্যা বাচ্চাগো কাপড় দেই, হেইটা পরাইয়া ঈদে যাইবে। এভাবেই ঝুপড়ি ঘরের বারান্দায় বসে কথাগুলো বলছিলেন মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামের বেঁড়িবাঁধের ধারে বসবাসকারী হাসিনা বেগম।

শনিবার (১৫ জুন) বিকেলে সরেজমিনে দশালিয়া গ্রামে ঘূর্ণিঝড় রেমেলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় গেলে অহিদুল ইসলামের স্ত্রী নাছিমা খাতুন নিজের ভাঙা বাড়ীর সামনে থেকে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, গত ৫/৬ দিন আমরা কোন ত্রাণ পাইনি। বেঁড়িবাঁধ ভাঙার পর কয়দিন পাইছি চাল, ডাল, পানি আর শুকনা খাবার। এখন বাড়ীতে কোন খাবার বা টাকাও নেই। প্রতিবেশিদের কাছ থেকে শুধু চাল ধার নিচ্ছি। এসব কথা বলতে বলতে তিনি এক পর্যায় কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের সাহায্য না করে, তাহলে আমরা আমাদের বাড়ীঘর তৈরি করতে পারব না।

একই এলাকার ৭০ বছরের বৃদ্ধ আফছার আলী বলেন, কম ক্ষতিগ্রস্থ কিছু মানুষ ত্রাণ পেয়েছে কিন্তু যারা ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে তারা কিছু পাচ্ছে না। সে দিন কারা আসল ১ হাজার করে টাকা দেছে কিন্তু আমরা পাই নি। ভাঙন মুখে তো আমরা। জনপ্রতিনিধিরা তাদের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ত্রাণ বিতরন করছে বলে অভিযোগ আফছার আলীর।

ভাঙন কুলের মুখে শহীদুল ইসলাম নামের একজন বলেন, উপকুলের নদী-খালে আমি মাছ ধরি। ঝড়ের পরে এখন তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। আয়-রোজগার নেই, এর মধ্যে ঈদ চলে এসছে। একমাত্র মেয়েটা সারাদিন কান্নাকাটি করছে একটা নতুন জামার জন্য। আমার তো নতুন জামা কিনে দেওয়ার মতো সাধ্য নেই। স্বাত্তনা ছাড়া মেয়েকে কিছুই দিতে পারছি না।

অপর দিকে একটু হেঁটে বেঁড়িবাঁধে উঠতেই দেখা যায় একজন ঘের মালিক ঘের থেকে উঠে আসছে তিনি বলেন, কদিন আগেই ঘূর্ণিঝড় রেমালে আমার মত অনেকের চিংড়ি ঘের ডুইবা সগল মাছ ভাইষ্যা গেছে। এ বিষয় কথা হয় মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামের ছোট খাট চিংড়ি চাষী আঃ রউফের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এ প্রতিবেদককে জানান, এবারের ঈদে কোরবানি করা তো দূরের কথা পোলাপানদের মুখে ভাল মন্দ খাবার দিতে পারব কিনা তাই ভাবতাছি।

তিনি বলেন, ছোট খাট পরিবার আমার সারা বছর আয় করি ৪ বিঘা চিংড়ি ঘের থেকে। বছরে বিঘা প্রতি জমি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা হারি দিয়ে ঘেরে বাগদা, হরিনা ও সাদা মাছ ছাড়ছি। এবছর ঘেরে আল্লাহ ভাল মাছ দিয়েছিল। তা আমাদের কপালে নেই, যে সময় মাছ উঠে ঠিক করে প্রতি বছর সেই সময় বেঁড়িবাঁধ ভাঙে। মরিবাঁচি জমিওয়ালার হারি ঠিকই দেয়া লাগবে। কিন্তু সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় রেমালে বেঁড়িবাঁধ ভাইঙ্গা শুধু আমার নয় আমার মত অনেকের চিংড়ি ঘের লোনা পানিতে ভাইষ্যা গেছে। তাই আমর মত অনেকের ঈদ আনন্দ কাইড়া নিছে ঐ ঘূর্ণিঝড় রেমাল।

অনুরুপ কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, মহারাজপুর, মহেশ^রীপুর, কয়রা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চিংড়ি ঘের বাঁধ ভাঙা পানি এবং অতি বৃষ্টির পানিতে ছোট বড় সহস্রাধিক চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এসব চিংড়ি চাষিরা। তাই নতুন করে চিংড়ি পোনা ছাড়া এবং ঘেরের রাস্তা সংস্কার করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। যে কারনে বাড়তি ঈদের খরচ যেন বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে অনেকের মাথায়।

এবারের ঈদ আনন্দ নিয়ে ভেসে যাওয়া অনেক চিংড়ি ঘের মালিকদের সাথে আলাপ করে জানান গেছে, ঘেরের চিংড়ি মাছ ধরা মৌসুমের শুরুতেই ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারনে ভেসে গেছে অধিকাংশ চিংড়ি ঘের। ফলে নতুন করে মোটা অংকের টাকা এ মহুর্তেই খরচ করতে হচ্ছে তাদের। খবর নিয়ে আরও জানা গেছে, এপ্রিল থেকে আগষ্ট পর্যন্ত চিংড়ি ধরার ভরা মৌসুম, যার শুরুটা মে মাসে এবং প্রতি বছর এই মে মাসেই ঘূর্ণিঝড় আঘাত আনে। যে কারনে চিংড়ি চাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

মহারাজপুর ইউপি চেয়াম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, ঈদ উপলক্ষে উপকূলীয় জনপদ সহ অন্যান্য এলাকায় গরিব দুস্থদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরন করা হবে। একটি তালিকা চুড়ান্ত করা হয়েছে আজ কার্যক্রম শেষ করা হবে।

ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি চাষিদের সরকারি কোন সহযোগিতা করা হবে কিনা এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম তারিক উজ জামানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারদের মাধ্যমে সার্বিক বিষয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এবং তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি ঘের মালিকদের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, অবশ্যই ঘূর্ণিঝড় রেমেলে ক্ষতিগ্রস্থ এবং ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি চাষিরা সরকারের সহযোগিতা পাবেন।

 

বাখ//আর

নিউজটি শেয়ার করুন

ঘূর্ণিঝড় রিমালে কাইড়্যা নিল আমাগো ঈদ আনন্দ

আপডেট সময় : ০৬:৪১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

রাত পোহালেই ঈদ, আমাগো কপালে কি আর ঈদ আছে ? তিনবেলা খাবার জুটতেছে না, তাই ঈদ নেই কোন ভাবনা নি। কোন জাগা থেকে কিছু পালি ছাবাল-মেয়ে দুটোর মুখি দে ঈদ এর দিনডা কাটাই দেবানে। বেটা অসুস্থ বেকার পইড়া আছে। আমিও বেটার সাথে নদীতে মাছ ধরি। ঝড়ের পরে নদীতে মাছ শাক পাওন যাচ্ছে না। ছাওয়ালের কাপড় দিমু ক্যামনে ? খাওনের পয়সা নাই, আর টাকা। যদি কোন সংগঠনের আফারা আইস্যা বাচ্চাগো কাপড় দেই, হেইটা পরাইয়া ঈদে যাইবে। এভাবেই ঝুপড়ি ঘরের বারান্দায় বসে কথাগুলো বলছিলেন মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামের বেঁড়িবাঁধের ধারে বসবাসকারী হাসিনা বেগম।

শনিবার (১৫ জুন) বিকেলে সরেজমিনে দশালিয়া গ্রামে ঘূর্ণিঝড় রেমেলে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় গেলে অহিদুল ইসলামের স্ত্রী নাছিমা খাতুন নিজের ভাঙা বাড়ীর সামনে থেকে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, গত ৫/৬ দিন আমরা কোন ত্রাণ পাইনি। বেঁড়িবাঁধ ভাঙার পর কয়দিন পাইছি চাল, ডাল, পানি আর শুকনা খাবার। এখন বাড়ীতে কোন খাবার বা টাকাও নেই। প্রতিবেশিদের কাছ থেকে শুধু চাল ধার নিচ্ছি। এসব কথা বলতে বলতে তিনি এক পর্যায় কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, সরকার যদি আমাদের সাহায্য না করে, তাহলে আমরা আমাদের বাড়ীঘর তৈরি করতে পারব না।

একই এলাকার ৭০ বছরের বৃদ্ধ আফছার আলী বলেন, কম ক্ষতিগ্রস্থ কিছু মানুষ ত্রাণ পেয়েছে কিন্তু যারা ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে তারা কিছু পাচ্ছে না। সে দিন কারা আসল ১ হাজার করে টাকা দেছে কিন্তু আমরা পাই নি। ভাঙন মুখে তো আমরা। জনপ্রতিনিধিরা তাদের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ত্রাণ বিতরন করছে বলে অভিযোগ আফছার আলীর।

ভাঙন কুলের মুখে শহীদুল ইসলাম নামের একজন বলেন, উপকুলের নদী-খালে আমি মাছ ধরি। ঝড়ের পরে এখন তেমন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। আয়-রোজগার নেই, এর মধ্যে ঈদ চলে এসছে। একমাত্র মেয়েটা সারাদিন কান্নাকাটি করছে একটা নতুন জামার জন্য। আমার তো নতুন জামা কিনে দেওয়ার মতো সাধ্য নেই। স্বাত্তনা ছাড়া মেয়েকে কিছুই দিতে পারছি না।

অপর দিকে একটু হেঁটে বেঁড়িবাঁধে উঠতেই দেখা যায় একজন ঘের মালিক ঘের থেকে উঠে আসছে তিনি বলেন, কদিন আগেই ঘূর্ণিঝড় রেমালে আমার মত অনেকের চিংড়ি ঘের ডুইবা সগল মাছ ভাইষ্যা গেছে। এ বিষয় কথা হয় মহারাজপুর ইউনিয়নের দশালিয়া গ্রামের ছোট খাট চিংড়ি চাষী আঃ রউফের সঙ্গে। তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে এ প্রতিবেদককে জানান, এবারের ঈদে কোরবানি করা তো দূরের কথা পোলাপানদের মুখে ভাল মন্দ খাবার দিতে পারব কিনা তাই ভাবতাছি।

তিনি বলেন, ছোট খাট পরিবার আমার সারা বছর আয় করি ৪ বিঘা চিংড়ি ঘের থেকে। বছরে বিঘা প্রতি জমি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা হারি দিয়ে ঘেরে বাগদা, হরিনা ও সাদা মাছ ছাড়ছি। এবছর ঘেরে আল্লাহ ভাল মাছ দিয়েছিল। তা আমাদের কপালে নেই, যে সময় মাছ উঠে ঠিক করে প্রতি বছর সেই সময় বেঁড়িবাঁধ ভাঙে। মরিবাঁচি জমিওয়ালার হারি ঠিকই দেয়া লাগবে। কিন্তু সম্প্রতি বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় রেমালে বেঁড়িবাঁধ ভাইঙ্গা শুধু আমার নয় আমার মত অনেকের চিংড়ি ঘের লোনা পানিতে ভাইষ্যা গেছে। তাই আমর মত অনেকের ঈদ আনন্দ কাইড়া নিছে ঐ ঘূর্ণিঝড় রেমাল।

অনুরুপ কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, মহারাজপুর, মহেশ^রীপুর, কয়রা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে চিংড়ি ঘের বাঁধ ভাঙা পানি এবং অতি বৃষ্টির পানিতে ছোট বড় সহস্রাধিক চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এসব চিংড়ি চাষিরা। তাই নতুন করে চিংড়ি পোনা ছাড়া এবং ঘেরের রাস্তা সংস্কার করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। যে কারনে বাড়তি ঈদের খরচ যেন বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে অনেকের মাথায়।

এবারের ঈদ আনন্দ নিয়ে ভেসে যাওয়া অনেক চিংড়ি ঘের মালিকদের সাথে আলাপ করে জানান গেছে, ঘেরের চিংড়ি মাছ ধরা মৌসুমের শুরুতেই ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারনে ভেসে গেছে অধিকাংশ চিংড়ি ঘের। ফলে নতুন করে মোটা অংকের টাকা এ মহুর্তেই খরচ করতে হচ্ছে তাদের। খবর নিয়ে আরও জানা গেছে, এপ্রিল থেকে আগষ্ট পর্যন্ত চিংড়ি ধরার ভরা মৌসুম, যার শুরুটা মে মাসে এবং প্রতি বছর এই মে মাসেই ঘূর্ণিঝড় আঘাত আনে। যে কারনে চিংড়ি চাষিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

মহারাজপুর ইউপি চেয়াম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, ঈদ উপলক্ষে উপকূলীয় জনপদ সহ অন্যান্য এলাকায় গরিব দুস্থদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরন করা হবে। একটি তালিকা চুড়ান্ত করা হয়েছে আজ কার্যক্রম শেষ করা হবে।

ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি চাষিদের সরকারি কোন সহযোগিতা করা হবে কিনা এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম তারিক উজ জামানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেম্বারদের মাধ্যমে সার্বিক বিষয়ে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এবং তার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি ঘের মালিকদের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, অবশ্যই ঘূর্ণিঝড় রেমেলে ক্ষতিগ্রস্থ এবং ক্ষতিগ্রস্থ চিংড়ি চাষিরা সরকারের সহযোগিতা পাবেন।

 

বাখ//আর