ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাংলা বাংলা English English हिन्दी हिन्दी

আন্তজার্তিক বাজারে কমছে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:০৬:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩
  • / ৪৫৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা খবর বিডি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো খারাপ খবরেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ‘অগ্নিকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস প্ল্যান্ট বন্ধ’, ‘ফ্রান্সের তেলের ডিপোয় ধর্মঘট’, ‘রাশিয়া ইউরোপের কাছে রুবলে জ্বালানির দাম পরিশোধ চায়’, অথবা ‘আবহাওয়া গতিপ্রকৃতি খারাপ’-এমন যেকোনো খবরে তেলের দাম বেড়েছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। এক বছর আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ১২০ ডলার। এখন তা ৭৫-৮০ ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম কমে এসেছে। গত আগস্ট মাসে যে গ্যাসের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩৫ ইউরো বা ৩৮ ডলার, সেখান থেকে দাম ৮৮ শতাংশ কমেছে।

আইসিই ফিউচারসে তথ্য অনুসারে গত কয়েকদিনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ১ ডলার ৩২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৭৯ ডলার ১১ সেন্টে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে (নিমেক্স) মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ ডলার ২২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৭৪ ডলার ২০ সেন্টে।

তবে, বিষয়টি এমন নয় যে, খবরটি বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই প্রভাব বিস্তার করে। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও তার সহযোগী দেশগুলো দফায় দফায় তেল উৎপাদন কমিয়েছে। জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনে থাকা তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা কমেছে টানা সাত সপ্তাহ ধরে। কারণ, দফায় দফায় দাম কমতে থাকায় উৎপাদনকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। নরওয়ের বেশ কিছু গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে আছে। ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ করে দিচ্ছে নেদারল্যান্ডস। তা সত্ত্বেও তেলের মূল্যবৃদ্ধির যেকোনো সম্ভাবনা দ্রুতই মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক কী কারণে এমন ঘটছে?

হতাশাজনক চাহিদা; অর্থাৎ, প্রত্যাশামতো চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়া এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে অর্ধেক হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এ খবরে বিশ্বজুড়ে মন্দার আশঙ্কা ঘনীভূত হয়। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির জোয়াল এখনো ইউরোপের ভোক্তাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। এই দুই মহাদেশেই মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি অনুভূত হয়নি। এ ছাড়া চীনে যে হারে কোভিড-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। প্রবৃদ্ধির এই নিম্ন হারের কারণে জ্বালানির চাহিদা কমেছে।

তবুও চাহিদার এই নিম্নগতির বিষয়টি গল্পের একটি অংশ মাত্র। এর হতাশাজনক পুনরুদ্ধারের গতি প্রত্যাশামতো না হওয়ায় গত এপ্রিল মাসে চীনে রেকর্ড দৈনিক ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়েছে। কোভিডে মহামারির সময় বিধিনিষেধ চলার সময়কালের চেয়ে চীনে মানুষের চলাচল, পর্যটনের পাশাপাশি পণ্যের পরিবহনও বেড়েছে। সে কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজেল, পেট্রোল এবং জেট জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে সেখানে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে। তেলের দামও এক বছর আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। ফলে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের উপযুক্ত শর্ত বিরাজমান। এশিয়া ও ইউরোপে উচ্চ তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ফলে সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের চাহিদা বাড়তি থাকবে।

এই বাস্তবতায় তেলের দাম কমতির দিকে কেন-এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর সরবরাহের দিক থেকে পাওয়া যেতে পারে। গত দুই বছর তেলের উচ্চ দামের কারণে ওপেকের বাইরের দেশগুলো তেল উৎপাদনে উৎসাহ পেয়েছে, যা এখন বাজারে আসতে শুরু করেছে। আটলান্টিক অঞ্চল থেকে বাজারে তেল আসছে। ব্রাজিল ও গায়ানা প্রচলিত ধারার কূপ থেকে তেল উত্তোলন করছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও কানাডায় শেল ও টার স্যান্ড থেকে তেল উৎপাদিত হচ্ছে। নরওয়েও বাজারে তেলের জোগান বাড়িয়েছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গানের হিসাবমতে, ২০২৩ সালে ওপেক–বহির্ভূত দেশগুলো থেকে দৈনিক তেল উৎপাদন ২২ লাখ ব্যারেল বাড়বে। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে ওপেক ও রাশিয়া যে হারে তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দিয়েছে এবং তার ওপর সৌদি আরব যে অতিরিক্ত হারে তেলের উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বাজারে ভারসাম্য আসার কথা।

এ ছাড়া গত এপ্রিল মাসে ওপেকের সদস্যরা দিনে ১২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দেয়। রাশিয়া দেয় দিনে ৫ লাখ ব্যারেল হ্রাসের। ওপেকের ঘোষণার বাইরে সৌদি আরব নিজে থেকে দিনে ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এসব দেশের উৎপাদন ঘোষণা অনুযায়ী খুব বেশি কমেনি।

ইকোনমিস্ট জানায়, ভেনেজুয়েলায় শেভরন বিনিয়োগ করেছে। ইরান ২০১৮ সালে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ার পর এখন সর্বোচ্চ তেল উৎপাদন করছে। বস্তুত, বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এখন আসছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলো থেকে। তারা কম দামে তেল বিক্রি করে দাম কমিয়ে দিচ্ছে।

এদিকে গ্যাসের ক্ষেত্রে আবার সরবরাহ পরিস্থিতি আরেকটু জটিল। রাশিয়া থেকে যে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে গ্যাস যায়, তা আপাতত বন্ধ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিপোর্ট এলএনজি গত বছর বিস্ফোরণের কারণে বন্ধ থাকার পর এ বছর উৎপাদনে এসেছে। পাইপলাইন ছাড়া ইউরোপে রাশিয়ার রপ্তানি অব্যাহত আছে; তবে ভিন্ন পথে। নরওয়ের সরবরাহ পুরোদমে চালু হবে মধ্য জুলাই থেকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইউরোপের হাতে বিশাল মজুত আছে। তাদের মজুত এখন সক্ষমতার ৭৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল কেবল ৫৩ শতাংশ। এবং ডিসেম্বরের আগে তাদের ৯০ শতাংশের লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার ধনী দেশগুলোতেও প্রচুর গ্যাস রয়েছে।

যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল এবং সুদের হার সীমিত ছিল, তখন পণ্য, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, ক্রমবর্ধমান মূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের দাম কমানোর দিকে ঠেলে দেয়। এখন যখন তারা মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের আশা করছেন, তখন এই আবেদনটি অনেকখানি ম্লান হয়ে গেছে- ঠিক যেমন উচ্চ হারের কারণে নগদ এবং বন্ডের মতো নিরাপদ সম্পদ।

ফলস্বরূপ, উচ্চ হারে অপরিশোধিত জ্বালানি হওয়ায় এ বাবদ খরচও বেড়ে গিয়েছিল। তাই প্রকৃত ব্যবসায়ীরা তাদের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতে ৮ কোটি ব্যারেল থেকে এপ্রিলে ৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে মজুত, যা ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকের পর সর্বনিম্ন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটে।

তেলের বাজার বিশ্লেষক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির পূর্বাভাসমতে, বৈশ্বিক তেলের চাহিদা ২০২৩ সালেই দিনে ১০ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়ে যাবে। তেলের সরবরাহও রেকর্ড উচ্চতায় উঠবে। কিন্তু পূর্বাভাস বলছে, এ বছরের দ্বিতীয় ভাগে বাজারে ঘাটতি তৈরি হবে। অনেক ব্যাংকও এমনটাই মনে করছে। এ ছাড়া শীতকাল এলে এলএনজির কার্গো ভাড়া করা নিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হবে। মালবাহী জাহাজের ভাড়া ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।

এত কিছু সত্ত্বেও গত বছর বিশ্ববাজারে তেলের বাজারে যে দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা কম।

অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি থাকবে, যা তিন অঙ্কের ঘর ছোঁবে না। শরৎকালে এশিয়া এবং ইউরোপের গ্যাস আসার সাথে সাথে দাম এখনকার চেয়ে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে, সেটাও খুব একটা চরম মাত্রায় পৌঁছাবে না। গত এক বছরে পণ্যের বাজার খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফলে এখন খারাপ খবরের আভাস পাওয়ামাত্র তেলের দাম বাড়বে না বলেই আশা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

আন্তজার্তিক বাজারে কমছে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম

আপডেট সময় : ১২:০৬:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো খারাপ খবরেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ‘অগ্নিকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস প্ল্যান্ট বন্ধ’, ‘ফ্রান্সের তেলের ডিপোয় ধর্মঘট’, ‘রাশিয়া ইউরোপের কাছে রুবলে জ্বালানির দাম পরিশোধ চায়’, অথবা ‘আবহাওয়া গতিপ্রকৃতি খারাপ’-এমন যেকোনো খবরে তেলের দাম বেড়েছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, তবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। এক বছর আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ১২০ ডলার। এখন তা ৭৫-৮০ ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম কমে এসেছে। গত আগস্ট মাসে যে গ্যাসের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩৫ ইউরো বা ৩৮ ডলার, সেখান থেকে দাম ৮৮ শতাংশ কমেছে।

আইসিই ফিউচারসে তথ্য অনুসারে গত কয়েকদিনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ১ ডলার ৩২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৭৯ ডলার ১১ সেন্টে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে (নিমেক্স) মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ ডলার ২২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৭৪ ডলার ২০ সেন্টে।

তবে, বিষয়টি এমন নয় যে, খবরটি বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই প্রভাব বিস্তার করে। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও তার সহযোগী দেশগুলো দফায় দফায় তেল উৎপাদন কমিয়েছে। জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনে থাকা তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা কমেছে টানা সাত সপ্তাহ ধরে। কারণ, দফায় দফায় দাম কমতে থাকায় উৎপাদনকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছে। নরওয়ের বেশ কিছু গ্যাস উৎপাদনকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে আছে। ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ করে দিচ্ছে নেদারল্যান্ডস। তা সত্ত্বেও তেলের মূল্যবৃদ্ধির যেকোনো সম্ভাবনা দ্রুতই মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক কী কারণে এমন ঘটছে?

হতাশাজনক চাহিদা; অর্থাৎ, প্রত্যাশামতো চাহিদা বৃদ্ধি না পাওয়া এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে অর্ধেক হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এ খবরে বিশ্বজুড়ে মন্দার আশঙ্কা ঘনীভূত হয়। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির জোয়াল এখনো ইউরোপের ভোক্তাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে। এই দুই মহাদেশেই মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে ধারাবাহিকভাবে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি অনুভূত হয়নি। এ ছাড়া চীনে যে হারে কোভিড-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। প্রবৃদ্ধির এই নিম্ন হারের কারণে জ্বালানির চাহিদা কমেছে।

তবুও চাহিদার এই নিম্নগতির বিষয়টি গল্পের একটি অংশ মাত্র। এর হতাশাজনক পুনরুদ্ধারের গতি প্রত্যাশামতো না হওয়ায় গত এপ্রিল মাসে চীনে রেকর্ড দৈনিক ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হয়েছে। কোভিডে মহামারির সময় বিধিনিষেধ চলার সময়কালের চেয়ে চীনে মানুষের চলাচল, পর্যটনের পাশাপাশি পণ্যের পরিবহনও বেড়েছে। সে কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি ডিজেল, পেট্রোল এবং জেট জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে সেখানে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও গ্রীষ্মকাল শুরু হয়েছে। তেলের দামও এক বছর আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম। ফলে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের উপযুক্ত শর্ত বিরাজমান। এশিয়া ও ইউরোপে উচ্চ তাপমাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ফলে সেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের চাহিদা বাড়তি থাকবে।

এই বাস্তবতায় তেলের দাম কমতির দিকে কেন-এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর সরবরাহের দিক থেকে পাওয়া যেতে পারে। গত দুই বছর তেলের উচ্চ দামের কারণে ওপেকের বাইরের দেশগুলো তেল উৎপাদনে উৎসাহ পেয়েছে, যা এখন বাজারে আসতে শুরু করেছে। আটলান্টিক অঞ্চল থেকে বাজারে তেল আসছে। ব্রাজিল ও গায়ানা প্রচলিত ধারার কূপ থেকে তেল উত্তোলন করছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা ও কানাডায় শেল ও টার স্যান্ড থেকে তেল উৎপাদিত হচ্ছে। নরওয়েও বাজারে তেলের জোগান বাড়িয়েছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গানের হিসাবমতে, ২০২৩ সালে ওপেক–বহির্ভূত দেশগুলো থেকে দৈনিক তেল উৎপাদন ২২ লাখ ব্যারেল বাড়বে। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে ওপেক ও রাশিয়া যে হারে তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দিয়েছে এবং তার ওপর সৌদি আরব যে অতিরিক্ত হারে তেলের উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, তাতে বাজারে ভারসাম্য আসার কথা।

এ ছাড়া গত এপ্রিল মাসে ওপেকের সদস্যরা দিনে ১২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দেয়। রাশিয়া দেয় দিনে ৫ লাখ ব্যারেল হ্রাসের। ওপেকের ঘোষণার বাইরে সৌদি আরব নিজে থেকে দিনে ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হ্রাসের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এসব দেশের উৎপাদন ঘোষণা অনুযায়ী খুব বেশি কমেনি।

ইকোনমিস্ট জানায়, ভেনেজুয়েলায় শেভরন বিনিয়োগ করেছে। ইরান ২০১৮ সালে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ার পর এখন সর্বোচ্চ তেল উৎপাদন করছে। বস্তুত, বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল এখন আসছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলো থেকে। তারা কম দামে তেল বিক্রি করে দাম কমিয়ে দিচ্ছে।

এদিকে গ্যাসের ক্ষেত্রে আবার সরবরাহ পরিস্থিতি আরেকটু জটিল। রাশিয়া থেকে যে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে গ্যাস যায়, তা আপাতত বন্ধ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিপোর্ট এলএনজি গত বছর বিস্ফোরণের কারণে বন্ধ থাকার পর এ বছর উৎপাদনে এসেছে। পাইপলাইন ছাড়া ইউরোপে রাশিয়ার রপ্তানি অব্যাহত আছে; তবে ভিন্ন পথে। নরওয়ের সরবরাহ পুরোদমে চালু হবে মধ্য জুলাই থেকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইউরোপের হাতে বিশাল মজুত আছে। তাদের মজুত এখন সক্ষমতার ৭৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল কেবল ৫৩ শতাংশ। এবং ডিসেম্বরের আগে তাদের ৯০ শতাংশের লক্ষ্যে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার ধনী দেশগুলোতেও প্রচুর গ্যাস রয়েছে।

যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল এবং সুদের হার সীমিত ছিল, তখন পণ্য, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, ক্রমবর্ধমান মূল্যের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের দাম কমানোর দিকে ঠেলে দেয়। এখন যখন তারা মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের আশা করছেন, তখন এই আবেদনটি অনেকখানি ম্লান হয়ে গেছে- ঠিক যেমন উচ্চ হারের কারণে নগদ এবং বন্ডের মতো নিরাপদ সম্পদ।

ফলস্বরূপ, উচ্চ হারে অপরিশোধিত জ্বালানি হওয়ায় এ বাবদ খরচও বেড়ে গিয়েছিল। তাই প্রকৃত ব্যবসায়ীরা তাদের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারিতে ৮ কোটি ব্যারেল থেকে এপ্রিলে ৬ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে মজুত, যা ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকের পর সর্বনিম্ন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটে।

তেলের বাজার বিশ্লেষক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির পূর্বাভাসমতে, বৈশ্বিক তেলের চাহিদা ২০২৩ সালেই দিনে ১০ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল ছাড়িয়ে যাবে। তেলের সরবরাহও রেকর্ড উচ্চতায় উঠবে। কিন্তু পূর্বাভাস বলছে, এ বছরের দ্বিতীয় ভাগে বাজারে ঘাটতি তৈরি হবে। অনেক ব্যাংকও এমনটাই মনে করছে। এ ছাড়া শীতকাল এলে এলএনজির কার্গো ভাড়া করা নিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হবে। মালবাহী জাহাজের ভাড়া ইতিমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে।

এত কিছু সত্ত্বেও গত বছর বিশ্ববাজারে তেলের বাজারে যে দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা কম।

অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি থাকবে, যা তিন অঙ্কের ঘর ছোঁবে না। শরৎকালে এশিয়া এবং ইউরোপের গ্যাস আসার সাথে সাথে দাম এখনকার চেয়ে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে, সেটাও খুব একটা চরম মাত্রায় পৌঁছাবে না। গত এক বছরে পণ্যের বাজার খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ফলে এখন খারাপ খবরের আভাস পাওয়ামাত্র তেলের দাম বাড়বে না বলেই আশা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট